কলকাতার আরজিকর মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের নারী ছাত্রীকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় উত্তাল গোটা পশ্চিমবঙ্গ। গত ৯ আগস্ট ওই ঘটনার পর বিচার চেয়ে ৩৪ দিন ধরে আন্দোলন, প্রতিবাদে সামিল রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষ।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চালাচ্ছে দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। আর এই তদন্তে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে সিবিআইয়ের হাতে। সামনে আসছে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরে ভুরি ভুরি দুর্নীতির অভিযোগ।
এমন এক প্রেক্ষিতে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরে পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছে রাজ্যের মানুষ। রাজ্যটির প্রধান বিরোধীদল বিজেপিও ‘দাবি এক দফা এক, মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ’ এই স্লোগান তুলে মিটিং, মিছিল করছে।
অন্যদিকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের অপসারণ চেয়ে লালবাজার অভিযানের ডাক দিয়েছিলো জুনিয়র চিকিৎসকরা। এরই পাশাপাশি রাজ্যের স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তার অপসারণ সহ পাঁচ দফা দাবিতে গত দুইদিন ধরে স্বাস্থ্য ভবনের সামনে ধরনা চালাচ্ছে তারা। জুনিয়র চিকিৎসকদের এই অনড় মনোভাবের কারণে গত প্রায় এক মাস ধরে রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রায় নেই বললেই চলে। সেবা না পেয়ে প্রায় ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে সরকারপক্ষ।
অচলাবস্থা কাটাতেই বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজ্য সরকারের সচিবালয় নবান্নে জুনিয়র চিকিৎসকদের সাথে বৈঠকের ডাক দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিকেল পৌনে পাঁচটায় বৈঠক হওয়ার কথা ছিলো। সাড়ে পাঁচটার একটু আগে জুনিয়র ডাক্তারদের বহনকারী একটি বাস নবান্নে এসে পৌঁছায়। ওই প্রতিনিধিদলে ছিলেন ৩২ জনের জুনিয়র চিকিৎসক। কিন্তু জুনিয়র চিকিৎসকদের দাবি ছিলো গোটা বৈঠকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘নো লাইভ স্ট্রিমিং, নো ডিসকাশন’। অর্থাৎ, মুখ্যমন্ত্রীর সাথে ওই বৈঠক সরাসরি সম্প্রচার করতে হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে মুখ্য সচিব মনোজ পন্থ জানিয়ে দেন, সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে চিকিৎসকরা নবান্নের সভাঘরে না ঢুকে, বাইরেই বাসের পাশে অপেক্ষা করছিলেন।
দু’পক্ষের অনড় মনোভাবের কারণে সেই বৈঠকে অনুষ্ঠিত হলো না। প্রায় দুই ঘণ্টা ১০ মিনিট নবান্নের সভাঘরে বসে থাকলেন মুখ্যমন্ত্রী। এরই মাঝে ১৪ তলায় নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসেন মমতা। ফের সভাঘরে এসে পৌঁছান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সেখানে অপেক্ষা করলেন স্বাস্থ্য দপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, মুখ্য সচিব মনোজ পন্থ, স্বরাষ্ট্র সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী, রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার। সামনের চেয়ার সবই ফাঁকা। পরে নবান্ন সভাঘর থেকে সংবাদ সম্মেলন করে কালীঘাটের বাড়ি ফিরে যান মুখ্যমন্ত্রী।
আর সেই সংবাদ সম্মেলন থেকে মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দেন, শীর্ষ আদালত লাইভ স্ট্রিমিং করতে পারে, কিন্তু আমরা তা পারি না। যেহেতু এই মামলাটি ভারতের শীর্ষ আদালতের বিচারাধীন, তাই কোনভাবেই লাইভ স্ট্রিমিং সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা ঠিক করেছিলাম বৈঠক যখন হবে তার সবটাই রেকর্ড হবে। স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য। আমরা তিনটি ভিডিও ক্যামেরা রেখে দিয়েছিলাম। আমরা পরে তা শেয়ার করে দিতাম।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন ‘পৌনে পাঁচটা থেকে দুই ঘন্টা দশ মিনিট অপেক্ষা করেছিলাম। ভেবেছিলাম, আমার ডাক্তার ভাই-বোনেদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। তারা এই বৈঠকে আসবেন। আমরাই চিঠি দিয়েছিলাম। সেই কারণে বৈঠক ডাকা হয়েছিলো।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলেন আমাকে, আমাদের মা-মাটি-মানুষের সরকারকে অনেক অসম্মান, অপমান করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক কুৎসা, অপপ্রচার রটানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ জানতেন না যে এর মধ্যে একটা রঙ আছে। মানুষ তিলোত্তমার বিচার চাইতে এসেছিলেন, কিন্তু আশা করি মানুষ বুঝতে পারছেন যে ওরা বিচার চায় না, ওরা চায় চেয়ার। আন্দোলনকারীদের মধ্যে দুই তিন জন আছে যারা আলোচনা চায় না। বাইরে থেকে নির্দেশ আসছে।
মমতা বলেন, মানুষের স্বার্থে আমি নিজে পদত্যাগ করতেও রাজি আছি। আমার মুখ্যমন্ত্রীর পদ চাই না। কিন্তু আমি চাই মানুষ বিচার পাক। তিলোত্তমা বিচার পাক। সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাক।
এক সময় হাতজোড় করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলার মানুষের আবেগের কাছে আমি আর জোর করে ক্ষমা চাইছি, আপনারাও আশায় ছিলেন যে আজকের সমস্যাটা সমাধান হয়ে যাবে বলে। আমি গত তিনদিন ধরে বসে আছি, শুধু আমি নয়, আমার সাথে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারাও আছেন। যে সমস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওদের অভিযোগ তাদের কাউকেই আমি বৈঠকে রাখিনি কারণ পাছে ওদের কষ্ট হয়। কিন্তু বৈঠকে আসবেন বলেও যারা নবান্নের গেট থেকেও এলেন না, তাদেরকে আবার ক্ষমা করে দিলাম তাদের কাছে আমার আবেদন থাকবে তারা যেন কাজে যোগদান করুন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমি জানি যে, যারা এসেছিলেন তাদের অনেকেই আলোচনা করতে আগ্রহী ছিলেন কিন্তু দু-তিনজনের কাছে বাইরে থেকে নির্দেশ আসছিল যে কোন রকম নেগোসিয়েশন যাতে না করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক ভেস্তে যাওয়ায় প্রশাসনকেই দায়ী করেছেন আন্দোলনকারী জুনিয়ার চিকিৎসকরা। মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ছাত্র অর্ণব মুখোপাধ্যায় বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য খুবই হতাশাজনক। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে যদি সুপ্রিমকোর্টে লাইভ স্ট্রিমিং হতে পারে, তবে রাজ্য প্রশাসন কেন পারবে না?
তার অভিমত, প্রশাসনিক জটিলতার জন্যই আজকের বৈঠক হলো না। চেয়ারের প্রতি আমাদের ভরসা আছে, তাই অপেক্ষা করছি। আমাদের বিশ্বাস আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান বেরোবে।