শাহরিয়ার কবির (খুলনা)
উন্নয়নের স্লোগান যত জোরে উচ্চারিত হয়, বাস্তবের এই নির্মম চিত্র ততই প্রশ্ন তোলে—কাদের জন্য সেই উন্নয়ন? একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থেকে আজ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি যাত্রা মানেই অনিশ্চয়তা, প্রতিটি পদক্ষেপ মানেই ঝুঁকি। মানুষ এখানে শুধু চলাচল করে না—প্রতিদিন নিজের জীবনকে বাজি রেখে পথ পাড়ি দেয়। কষ্ট, ক্ষোভ আর অবহেলার এই গল্প যেন কারও কানে পৌঁছায় না।
খুলনার পাইকগাছা উপজেরার ৫নং সোলাদানা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের আমুরকাটা বাজার থেকে চৌরাস্তা অভিমুখী এই সড়কটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের একমাত্র নির্ভরতার পথ। অথচ যে পথ একসময় স্বস্তি আর যোগাযোগের প্রতীক ছিল, আজ তা ভাঙাচোরা, ক্ষতবিক্ষত ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। খানাখন্দে ভরা এই সড়ক যেন প্রতিটি মুহূর্তে নীরব প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—এই পথে পা ফেললে তুমি কি আদৌ নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে?
সড়কটি শুধু একটি যোগাযোগপথ নয়—পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দৈনন্দিন সব ধরনের কার্যক্রমে যাতায়াতের একমাত্র ভরসার পথ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা এই সড়ক এখন ভাঙা ইটের সলিংয়ে এলোমেলো ও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। কোথাও ইট উঠে গেছে, কোথাও আবার উঁচু-নিচু হয়ে যানবাহন চলাচল প্রায় অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অস্থায়ীভাবে ইটের সলিং করে দায়সারা উন্নয়ন করা হলেও তা টেকসই হয়নি। ফলে এখন এই সড়কে ভ্যান, ইজিবাইক ও নসিমন চলাচল করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে এই পথ এখন আর স্বস্তির নয়, বরং এক ধরনের অনিশ্চিত যাত্রা।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভ্যানচালক আব্দুল করিম বলেন, “এই রাস্তায় চলতে গেলে মনে হয় জীবন হাতে নিয়ে বের হই। গাড়ি প্রায়ই নষ্ট হয়, আয়ও কমে গেছে।”
ইজিবাইক চালক সোহেল গাজী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিশ্রুতি শুধু শুনি, কাজ দেখি না। ভোটের সময় সবাই আসে, পরে আর কেউ খোঁজ নেয় না।”
গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, “অসুস্থ মানুষ নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া ভয়ংকর। কখন কী হয়ে যায়, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়।”
স্থানীয়দের দাবি, এখন আর অস্থায়ী ইটের সলিং নয়—এই সড়কটিকে টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে পিচের (পাকা) রাস্তায় রূপান্তর করতে হবে। তাদের মতে, এই রাস্তা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং পুরো এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
পীযূষ কান্তি মন্ডল (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান, ৫নং সোলাদানা ইউনিয়ন পরিষদ বলেন,“আমুরকাটা বাজার থেকে চৌরাস্তা অভিমুখী সড়কটির বেহাল অবস্থার বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ আমরা উপলব্ধি করছি। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা চলছে। বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজটি বাস্তবায়ন করা হবে।”
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—কতদিন এই কষ্টের বোঝা বয়ে বেড়াবে মানুষ? কতদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবহেলায় পড়ে থেকে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে? উন্নয়নের আলো যদি এই পথ ছুঁতে না পারে, তবে সেই উন্নয়নের অর্থই বা কী?