ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। গত পাঁচ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর বর্তমানের বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে দূরপাল্লার মিসাইল ও ল্যান্ডমাইন দেয়ার ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।
এরই মধ্যে যুদ্ধে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সরবরাহ করা দূরপাল্লার মিসাইল দিয়ে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে ইউক্রেন। যদিও রাশিয়া দাবি করেছে, তাদের আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থা ইউক্রেনের ছোড়া ওই ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে।
এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মস্কো যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, তার দেশটির হাতে ‘ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত’ শক্তিশালী নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ আছে। তিনি বলেন, ‘ওরেশনিক মিসাইল’কে বাধা দেয়া যায় না।
ইউক্রেনের নিপ্রো শহরে নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একদিন পর তিনি এমন মন্তব্য করলেন। পুতিন আরও জানিয়েছেন, ওরেশনিক হাইপারসনিক মিসাইল শব্দের চেয়ে ১০ গুণ গতিতে উড়ে যায় এবং তিনি এগুলো উৎপাদনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ধরনের মিসাইকে বাধা দেয়া যায় না।
এর আগে তিনি বলেছিলেন, ইউক্রেনের ‘স্টর্ম শ্যাডো’ ও ‘অ্যাটাকএমএস’ মিসাইল ব্যবহারের জবাবে এই নতুন ধরনের মিসাইল ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি নতুন এই মিসাইলের আরও পরীক্ষা চালানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন, এমনকি যুদ্ধের মধ্যেও।
পুতিন এক নির্ধারিত টেলিভিশন ভাষণে বলেন, ওরেশনিক মিসাইল (আকাশ সুরক্ষা ব্যবস্থায়) আটকানো যাবে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমাদের কাছে যেসব অস্ত্র আছে, বিশ্বের আর কোনো দেশের কাছে সেসব নেই। তিনি ‘ওরেশনিক’ মিসাইলে পরীক্ষা চালিয়ে যাবেন বলেও জানান।
এর আগে বৃহস্পতিবার এ মিসাইলের সফল পরীক্ষা করা হয়। এরপর রুশ প্রতিরক্ষা বিভাগের শীর্ষ প্রতিনিধি ও নিজের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন পুতিন। সেখানে তিনি ‘ওরেশনিক’ মিসাইল পরীক্ষা সফল হওয়ায় সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
রাশিয়া যেহেতু নতুন হুমকির মুখে, তাই নতুন মিসাইলের উন্নয়ন অত্যাবশ্যক বলে মন্তব্য করেন পুতিন। ‘মিসাইলগুলো প্রস্তুত আছে, যে কোনো সময় এসব কাজে লাগানো হবে বলেও ওই বৈঠকে উল্লেখ করেন রুশ প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, আমাদের কাছে এর মজুত রয়েছে, যা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত।
কিয়েভের হামলার পর গত বৃহস্পতিবার নিপ্রো এলাকায় নতুন ধরনের মিসাইল দিয়ে হামলা চালায় রাশিয়া। এ সময় রাশিয়া একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল (আইসিবিএম) ব্যবহার করেছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ। এ হামলার ফলে যে বিস্ফোরণ হয়েছে, তা তিন ঘণ্টা পর্যন্ত চলছিলো।
মিসাইলসহ ওই হামলা ছিলো খুবই শক্তিশালী এবং হামলার পর ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন যে এটা ছিলো আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইলের মতো। তখন বলা হয়, যদি এটা সত্যি হয়, তবে গত আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলা এ যুদ্ধে এই প্রথম রাশিয়া আইসিবিএম ব্যবহার করল। ইতিহাসেও কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তিশালী এ মিসাইলের প্রথম ব্যবহার হবে এটি।
কিয়েভের এ দাবির কয়েক ঘণ্টা পর রাশিয়া ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথা জানায়। এটি রাশিয়ার ‘নতুন ধরনের একটি মাঝারি পাল্লার মিসাইল’। এর আগে গত মঙ্গল ও বুধবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তৈরি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছিল ইউক্রেন।
রিস্ক অ্যাডভাইজরি কোম্পানি সিবিলাইনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জাস্টিন ক্রাম্প বিবিসিকে বলেছেন, মস্কো সতর্কতা হিসেবে ওই হামলা করে থাকতে পারে। তার মতে যে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে তা এতো দ্রুতগামী ও আধুনিক যে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
এদিকে, নিপ্রোতে হামলার পর পুতিনকে ‘তাঁর কৃতকর্মের বাস্তব পরিণতি অনুভব করাতে’ বিশ্বনেতাদের প্রতি ‘গুরুতর প্রতিক্রিয়া’ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি পশ্চিমা মিত্রদের কাছে ইউক্রেনে আরও আধুনিক আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থা পাঠানোর কথা বলেছেন।
সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স-ইউক্রেনের খবরে বলা হয়েছে, কিয়েভ যুক্তরাষ্ট্রের টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) মিসাইল চেয়েছে অথবা তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও আধুনিক করতে বলেছে।