ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি:
একটা সময় তিনি ছিলেন অটোরিকশাচালক। পরিশ্রমেই গড়েছিলেন নিজের ছোট্ট সংসারের স্বপ্নভবন। সেই স্বপ্নে ছিল সন্তানের মুখে এক চিলতে হাসি, স্ত্রীর মলিন মুখে একটু তৃপ্তির রেখা। কিন্তু বাস্তব বড়ই নির্মম। শোষণ আর চাঁদাবাজির এই নগ্ন যুগে মনজুরুল ইসলামের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে গেছে রাষ্ট্রের ছায়াতেই।
বুধবার (২৩ জুলাই) দুপুর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বুকে, শ্রীপুর পৌরসভার মাওনা চৌরাস্তা উড়ালসেতুর নিচে পড়ে আছে এক অসহায় যুবক, পাশে তার শিশু সন্তান। শত শত যানবাহনের গতি থেমে গেছে কিছুক্ষণ। হেলমেট পরা পুলিশ, পথচারী, সংবাদকর্মী সবারই চোখে বিস্ময়। কিন্তু সে বিস্ময়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল বাবার সেই প্রতিবাদ যেখানে নেই কোনো স্লোগান, নেই কোনো দলীয় পতাকা আছে শুধু জীবনের নিঃশব্দ আর্তনাদ।
মনজুরুল ইসলাম বলেন, “পুলিশের প্রতিদিনের চাঁদা দিতে না পেরে অটোরিকশাটা বিক্রি করে দিছি ভাই। ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করছিলাম, সেটাও ঠিকমতো চালাতে পারি না। নেতা-নেত্রীরা জায়গা দিতেও চাঁদা চায়। এই শহরে গরিবের বাঁচার জায়গা নাই!”
বুকে কষ্টের পাহাড়, মুখে তীব্র ক্ষোভ আর সন্তানকে ঘিরে নিঃশেষ ভালোবাসা নিয়ে মহাসড়কে শুয়ে পড়েছিলেন তিনি। ওই মুহূর্তে যিনি দাঁড়িয়ে ছিল, তারা প্রত্যেকেই যেন একপলকে চোখ মুছে নিতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি। কেউ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেসও করেনি, “আপনার কী লাগবে?”
পাশে বসে থাকা শিশুটি তখনো জানে না রাষ্ট্র, প্রশাসন বা দুর্নীতির কথা। সে শুধু ক্ষুধা চেনে। কিছুক্ষণ পর কান্না জুড়ে দেয় সে। ছোট্ট হাতে বাবার মুখ ছুঁয়ে বলে, “বাবা, আমরা বাড়ি যাবো?”
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই বাবার কাছে। সমাজ তাকে কেবল চাঁদা চায়, পুলিশ চায় টাকা, নেতা চায় ‘ভাগ’ কিন্তু তার সন্তান চায় একটু ভাত, একটু শান্তি।
এই একটি ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের অসাড়তা। একটি পরিবারকে পথে শুয়ে পড়তে বাধ্য করেছে পুলিশ আর স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি। এই দায় কার? কে দেবে মনজুরুলের সন্তানের উত্তর?
স্লোগান নয়, ব্যানার নয় মনজুরুলের প্রতিবাদ হয়ে উঠেছে আমাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি। যখন রাষ্ট্র নীরব, বিচার অদৃশ্য আর মানবতা অবহেলিত, তখন এমন প্রতিবাদ কাঁপিয়ে দেয় বিবেক।
এই প্রতিবেদন কোনো একক ব্যক্তির কান্না নয়, এটি হাজারো মনজুরুলের গল্প। সেই গল্প যারা প্রতিদিন বাঁচার জন্য লড়েন, অথচ রাষ্ট্র যাদের চিনে না, সমাজ যাদের শোনে না।