আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যকার সম্পর্ক এক সময়কার ‘উষ্ণ বন্ধুত্ব’ থেকে এখন ‘সংঘর্ষের দ্বারপ্রান্তে’ এসে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল। রুশ ট্যাবলয়েড মস্কোভস্কি কমসোমোলেটস বিষয়টিকে তুলনা করেছে দুটি দ্রুতগামী লোকোমোটিভের সাথে—যারা একে অপরের দিকে ধেয়ে আসছে, কিন্তু কোনো পক্ষই থামছে না।
এই রেলগাড়ির রূপক দিয়ে বোঝানো হয়েছে, একদিকে পুতিন তার তথাকথিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, অন্যদিকে ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে পুতিনকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছেন এবং সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছেন। তিনি দাবি করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই রাশিয়ার নিকটবর্তী এলাকায় দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েন করেছে।
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর শুরুতে রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবল চেষ্টা করেন। ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি ইউক্রেনপন্থী প্রস্তাবের বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে একরকম কূটনৈতিক সমর্থনই দিয়েছিল। সে সময় দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান একে অপরকে রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং পুতিন-ট্রাম্প শীর্ষ সম্মেলনের সম্ভাবনাও জোরালো হয়ে ওঠে।
তবে কিছুদিন পরই সম্পর্কের গ্রাফ নামতে শুরু করে। ক্রেমলিন যুদ্ধবিরতির কোনো আগ্রহ দেখায়নি। বরং ইউক্রেনের শহরগুলোর উপর একের পর এক রুশ হামলা ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। একপর্যায়ে ট্রাম্প পুতিনকে ৫০ দিনের আল্টিমেটাম দেন, পরে তা কমিয়ে ১০ দিন করা হয়। ট্রাম্পের কড়া ভাষায়, এসব হামলা ‘ঘৃণ্য ও লজ্জাজনক’।
ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ গত কয়েক মাসে চারবার মস্কো সফর করেছেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। একবারের বৈঠকে পুতিন নিজে উইটকফকে ট্রাম্পের একটি প্রতিকৃতি উপহার দেন। যদিও এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি সত্ত্বেও যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
রুশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের মতে, পুতিন এখনো ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা, ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক কাঠামো নিয়ে আপোস করতে নারাজ। ট্রাম্প চুক্তি করতে চান, কিন্তু পুতিন চাইছেন বিজয়। নিউইয়র্কের দ্য নিউ স্কুলের অধ্যাপক নিনা ক্রুশ্চেভা বলেন, “পুতিন এখনো নিজেকে জার ও স্তালিনের উত্তরসূরি মনে করেন। তিনি মনে করেন পশ্চিমারা রাশিয়ার প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখায়নি।”
তীব্র উত্তেজনার মাঝেও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, মুখোমুখি সংঘর্ষ এখনও অনিবার্য নয়। ট্রাম্প নিজেকে বরাবরই ‘চুক্তির মাস্টার’ হিসেবে তুলে ধরেন এবং রাশিয়ার সঙ্গে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা চূড়ান্ত করতে চান। চলতি সপ্তাহেই স্টিভ উইটকফ আবারও রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে হয়তো এমন কোনো প্রস্তাব থাকবে যা যুদ্ধের অবসানের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরের যুদ্ধে ক্লান্ত রাশিয়া কি সত্যিই সংলাপের মাধ্যমে সমাধানে প্রস্তুত? ট্রাম্পের ইচ্ছা আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবেন পুতিন।