মো: রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি, শেরপুর
শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ সামাজিক উৎসব ওয়ানগালা (নবান্ন) শুরু হয়েছে। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১১টায় মরিয়মনগর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের উদ্বোধন করেন ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের কার্ডিনাল বিশপ প্যাট্রিক ডি. রোজারিও।
উদ্বোধনী বক্তব্যে কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি. রোজারিও বলেন, “উৎসব মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মিলনমহনা। এখানে রয়েছে জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রকাশ। বাহির থেকে কিছু নয়—যা আমাদের, যা আমরা পরম্পরায় পেয়েছি, তাই উদযাপিত হয় ওয়ানগালায়। এই উৎসব নতুন প্রজন্মকে আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা অনুপ্রেরণার সাথে পৌঁছে দেয়।”
মরিয়মনগর ক্রিশ্চিয়ান মিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পালপুরোহিত ফাদার লরেন্স রিবেরু। বক্তব্য দেন প্যারিস কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অনার্শন চাম্বুগং।
গারোদের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ এ উৎসবকে বলা হয় ‘ওয়ানগালা’। ‘ওয়ানা’ অর্থ দেবদেবীর দানের দ্রব্যসামগ্রী আর ‘গালা’ অর্থ উৎসর্গ করা। নতুন ফসল ঘরে তোলার পর দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও অনুমতি প্রার্থনায় গারোরা নেচে-গেয়ে উদযাপন করেন এ উৎসব। ফসল কাটার আগে নতুন শস্য ভক্ষণ নিষিদ্ধ থাকায় একে নবান্ন বা ধন্যবাদের উৎসবও বলা হয়। আবার একশ ঢোলের তালে আয়োজন হওয়ায় এটি ‘একশ ঢোলের উৎসব’ নামেও পরিচিত।
গারোদের বিশ্বাস, ‘মিসি সালজং’ বা শস্যদেবতার আশীর্বাদে হয় ভালো ফসল। তাই নতুন ফসল ঘরে তোলার আগে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানানোই এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। একইসঙ্গে পরিবারে ভালোবাসা, শান্তি ও মঙ্গল কামনা করা হয় শস্যদেবতার কাছে।
উৎসব উপলক্ষে এবার কিশোর-কিশোরীদের চিত্রাঙ্কন, ছড়া (মান্দি ভাষায়), নৃত্য, মিস ওয়ানগালা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা ও বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে বাণী পাঠ (মান্দি), খামালকে খুখুব ও থক্কা প্রদান, জনগণকে থক্কা দেওয়া, পবিত্র খ্রিস্টযাগ, দান সংগ্রহ, প্রার্থনা, আলোচনাসভা ও নকগাথা অনুষ্ঠান। উৎসব ঘিরে বিদ্যালয় মাঠে বসেছে অস্থায়ী দোকান—যেখানে পাওয়া যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, খাবার ও শিশুদের নানা ধরনের খেলনা।
ওয়ানগালা উৎসব কমিটির আহ্বায়ক ও মরিয়মনগর ধর্মপল্লীর পালপুরোহিত ফাদার লরেন্স রিবেরু সিএসসি জানান, ১৯৮৫ সাল থেকে মরিয়মনগর সাধু জর্জের ধর্মপল্লীর উদ্যোগে নিয়মিতভাবে ওয়ানগালা উৎসব উদযাপন করা হচ্ছে। গারোদের প্রাচীন সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্ম ও বৃহত্তর সমাজের কাছে পরিচিত করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য
আগামী রবিবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে এবারের ওয়ানগালা উৎসব।