শাহরিয়ার কবির (খুলনা)
শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ “স্কুল ফিডিং কর্মসূচি” এখন খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় অনিয়ম ও মানহীন খাদ্য বিতরণের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। ১৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচালিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল কোমলমতি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যা কমিয়ে আনা। তবে বাস্তবে কিছু চক্রের গাফিলতি ও অনিয়মের কারণে এই মহতী উদ্যোগের সুফল নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কয়েকটি বিদ্যালয়ে সরবরাহকৃত বনরুটির প্যাকেটে উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ নেই, যা খাদ্য নিরাপত্তা বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া নির্ধারিত সরকারি মেনুর সঙ্গে বাস্তব খাবারের অমিল পাওয়া গেছে। কোথাও বিস্কুটের পরিবর্তে অপরিপক্ব ও ছোট আকারের কলা দেওয়া হচ্ছে, আবার কোনো কোনো দিন অর্ধসিদ্ধ ডিম সরবরাহ করা হচ্ছে—যা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন অভিভাবক ও চিকিৎসকরা।
সরকারের এই পুষ্টি সহায়ক কর্মসূচিকে ঘিরে অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, সরকারি উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নে গাফিলতির কারণে শিশুদের স্বাস্থ্য এখন ঝুঁকিতে পড়ছে। এক অভিভাবক বলেন, “সরকার ভালো উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু কিছু জায়গায় অনিয়মের কারণে আমাদের শিশুরা ঠিকমতো খাবার পাচ্ছে না।”
আরেকজন অভিভাবক জানান, “রুটির গন্ধ অস্বাভাবিক লাগে, বাচ্চারা অনেক সময় খেতেই চায় না।”একজন মা বলেন, “এই খাবার যদি মানসম্মত না হয়, তাহলে সরকারের এত সুন্দর উদ্যোগের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।”নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক জানান, “আমরা শুধু যা সরবরাহ আসে সেটাই বিতরণ করি। অনেক সময় মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আমাদের কিছু করার থাকে না।”
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানারা বিনতে আহমেদ বলেন, “সরকারের স্কুল ফিডিং কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শিশুদের জন্য উপকারী উদ্যোগ। তবে মানহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ডায়রিয়া, বমি ও ফুড পয়জনিংয়ের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্জয় দেবনাথ বলেন, “সরকারের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী স্কুল ফিডিং কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কিছু অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। সেগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সাইফুল ইসলাম (ওসাকা, পাবনা) বলেন, “যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একদিন প্যাকেজিংয়ে তারিখ ছাপা হয়নি। বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিমুজ্জামান চৌধুরী জানান, বিষয়টি তার দপ্তরের সরাসরি আওতাভুক্ত না হলেও তিনি অবগত হয়েছেন। তিনি বলেন, “বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।”
সচেতন মহল মনে করছে, সরকারের এমন একটি জনকল্যাণমূলক ও প্রশংসনীয় পুষ্টি কর্মসূচিতে কিছু অসাধু চক্রের অনিয়ম চলতে থাকলে তা বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে এবং সরকারের মহতী উদ্যোগের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত তদন্ত, মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।