আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
গাজার বিধ্বস্ত নগরীতে আজ মানুষের মুখে খাবার নেই, ঘরে নেই পানি, ঔষধ কিংবা বিদ্যুৎ। শুধু আছে ধ্বংসস্তূপ, ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর মৃতপ্রায় মানুষের আর্তনাদ। এই বিভীষিকাময় বাস্তবতার মধ্যেই এক রাত গভীর নির্জনে ক্ষুধার্ত ভাই-বোনদের জন্য একমুঠো খাবার সংগ্রহ করতে বের হয়েছিল ফিলিস্তিনি কিশোর আবদুল রহমান আবু জাজার। বয়স মাত্র ১৫। জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে এখন তার থাকার কথা স্কুলের বেঞ্চে, বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার মাঠে। অথচ সে গিয়েছিল এক ত্রাণকেন্দ্রে, যেখানে পৌঁছাতে তার লেগেছে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা হেঁটে, দৌঁড়ে, মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে।
জায়গাটি ছিল গাজা সিটির আল-মুনতাজাহ পার্ক এলাকার জিএইচএফ ত্রাণকেন্দ্র। সেই কেন্দ্রই পরিণত হয় রক্তাক্ত এক মৃত্যুকূপে। হঠাৎ করেই শুরু হয় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ। চোখে সরাসরি গুলি করে বসে এক সেনা, ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় আবদুল রহমানের বাঁ চোখ। তারপরও থেমে থাকেনি গুলির বৃষ্টি। গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এই কিশোর।
হাসপাতালের বিছানায় এক চোখে সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা, নিস্তেজ কণ্ঠে আল জাজিরাকে আবদুল রহমান বলেন, “আমি দৌঁড়াচ্ছিলাম, আমার সঙ্গে ছিল আরও তিনজন। হঠাৎ গুলির শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। সবাই ছুটছিল, আমি চোখে গুলিবিদ্ধ হই। তারপরও তারা থামেনি, ওরা গুলি চালাতেই থাকে। তখন মনে হচ্ছিল, আজই বুঝি শেষ।”
অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা জাজার জ্ঞান ফিরে পায় অনেক পরে। তখন জিজ্ঞেস করে, সে কোথায়। পাশে থাকা মানুষজন জানায়, সে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ইতোমধ্যে তার চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। এই কোমলমতি কিশোর এখন শুধু একটাই প্রার্থনা করে, “আল্লাহ যেন আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন।”
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৯২ জন, যাদের মধ্যে ৫৬ জন ছিলেন ত্রাণের জন্য অপেক্ষমাণ। সব মিলিয়ে গতকাল রোববার পাওয়া গেছে ১১৯টি মৃতদেহ, যার ১৫টি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৬৬ জনের বেশি আহত মানুষ।
হাসপাতাল সূত্রের তথ্য বলছে, ইসরায়েলি বাহিনী এখন এমনকি ত্রাণকেন্দ্র কিংবা হাসপাতালও ছেড়ে কথা বলছে না। কোনো নীতিমালা নেই, মানবতাবোধ নেই, নেই যুদ্ধবিরতির বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত।
আবদুল রহমান আবু জাজারের চোখ হারানোর এই নির্মম ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। বরং তা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিদিনের বাস্তবতা। যাদের অপরাধ, তারা ফিলিস্তিনি, মুসলমান, আর নিজের ভিটেমাটিতে বাঁচতে চায়। বিশ্বের নীরবতা এখন যেন আরও স্পষ্টভাবে এঁকে দিচ্ছে অন্যায় আর বৈষম্যের এক ভয়ংকর পটচিত্র।
আজ, এই রক্তাক্ত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমরা কেবল একটি প্রশ্ন করতে পারি, একজন কিশোর যখন একমুঠো খাবারের জন্য বের হয়ে চোখ হারায়, তখন সভ্যতা কোন মুখে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার দাবি করে?