ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে পাহাড়, হ্রদ আর মেঘের শহর রাঙ্গামাটি পরিণত হয়েছে পর্যটকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্যে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ ভিড় করছেন এই পার্বত্য জেলায়। দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে এতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে স্থানীয় পর্যটন খাত।
রোববার (২২ মার্চ) সকাল থেকে রাঙ্গামাটিতে পর্যটকদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। সোমবার সকাল থেকেই পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠতে শুরু করে পর্যটন কেন্দ্রগুলো। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বিস্তৃত কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলরাশি আর সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ বরাবরই রাঙ্গামাটিকে করেছে অনন্য। ঋতুভেদে রূপ বদলানো এই জনপদ ঈদের ছুটিতে যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে পর্যটন জায়গা থেকে শুরু করে সবখানেই এখন দর্শনার্থীদের সরব উপস্থিতি।
‘সিম্বল অব রাঙ্গামাটি’ হিসেবে পরিচিত পর্যটন কমপ্লেক্সের ঝুলন্ত সেতুতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপচে পড়া ভিড়। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটাতে ব্যস্ত পর্যটকরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা হ্রদের সৌন্দর্যে ডুবে যাচ্ছেন নীরবে। কাপ্তাই হ্রদের বুকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা কিংবা স্পিডবোটে ভ্রমণ পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। হ্রদের স্বচ্ছ জল আর চারপাশের সবুজ পাহাড়ের মাঝে নৌভ্রমণ এনে দিচ্ছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এতে খুশি স্থানীয় বোট মালিক ও চালকরাও।
নোয়াখালী থেকে বেড়াতে আসা হোসেন পাভেল ও আয়েশা দম্পতি বলেন, ‘বেড়াতে আসার কথা হলেই আমরা চেষ্টা করি একটু পাহাড়ের দিকে আসতে। সেক্ষেত্রে রাঙ্গামাটি আমাদের কাছে সবসময়ই পছন্দের শীর্ষে থাকে। ঈদের লম্বা ছুটিতে তাই পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসলাম। বেশ ভালো লাগছে সবকিছু।’
রাঙ্গামাটি পর্যটন নৌ-যান চালক কল্যাণ সমিতির সভাপতি এ বি এম সালাহ উদ্দিন জানান, ঈদের ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে এখন তারা স্বস্তিতে রয়েছেন। পর্যটকদের চাপ থাকায় তাদের বোটগুলো ভাড়া হচ্ছে। পর্যটকরা বোটে করে কাপ্তাই হ্রদ ভ্রমণে যাচ্ছেন।
শহরের আরেক জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র পলওয়েল পার্কেও দেখা গেছে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। লাভ পয়েন্ট, কায়াকিং, মিনি ঝুলন্ত সেতু এবং হ্রদের পাড়ে বসে সময় কাটানোর সুযোগ পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা এখানে কাটাচ্ছেন আনন্দঘন সময়।
শুধু রাঙ্গামাটি শহরেই নয়, জেলার অন্যতম আকর্ষণ সাজেক ভ্যালিতেও এখন পর্যটকদের সরব উপস্থিতি। পাহাড় আর মেঘের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা সাজেক যেন এক স্বর্গরাজ্য। কটেজগুলোতে প্রায় পূর্ণ দখল, চারদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
কটেজ এন্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সাজেকের সভাপতি সুপর্ন দেব বর্মন বলেন, ‘গতকাল থেকে সাজেকে বেশ ভালো পর্যটক আসছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে প্রায় ৩ হাজারের অধিক পর্যটক সাজেক এসেছেন। আমাদের সব রিসোর্ট, কটেজ শতভাগ বুকিং রয়েছে।’
পর্যটকদের এই ঢলে সবচেয়ে বেশি স্বস্তিতে রয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘদিনের ধীরগতির পর এখন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এসেছে গতি। রাঙ্গামাটি শহরের অধিকাংশ হোটেল ও মোটেলে বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং রয়েছে, যা আগামী কয়েক দিনে আরও বাড়বে বলে আশা করছেন মালিকরা।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। নিয়মিত টহল ও নজরদারির ফলে পর্যটকরা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতে পারছেন।
রাঙ্গামাটি জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের উপ-পরিদর্শক উইলিয়াম ত্রিপুরা জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। জেলার সব পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আমরা আমাদের টহল কার্যক্রম জোরদার করেছি। আশা করছি পর্যটকদের কোনো প্রকার অসুবিধা হবেনা।
রাঙ্গামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে পর্যটকরা রাঙ্গামাটি ভ্রমণে এসেছেন। আমরা তাদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের মোটেল কটেজগুলো প্রায় শতভাগ বুকিং হয়ে গেছে। পাশাপাশি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজারের অধিক পর্যটক ঝুলন্ত সেতু ভ্রমণ করছেন।’