বিনোদন ডেস্কঃ
বাংলা সংগীতের আকাশে কিছু নাম থাকে, যারা সময়ের সীমা ছুঁয়ে যায়—যাদের সুর কেবল গান হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে অনুভব, স্মৃতি আর নীরব দীর্ঘশ্বাসের এক অনন্ত পরিসর। লাকী আখান্দ সেই বিরল নামগুলোরই একজন, যিনি সুরের ভেতর দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক স্বতন্ত্র জগৎ—যেখানে গান মানে ছিল জীবন, আর জীবন মানে ছিল গান।
১৯৯৮ সালের এক দাহ্য বিকেলের কথা। ঢাকা শহরের উত্তাপে যখন মানুষের ক্লান্তি চরমে, জাতীয় জাদুঘরের এক আসরে নেমে এসেছিল সুরের শীতলতা। সেই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী অঞ্জন দত্ত। গানের আসরটি যেন কেবল অনুষ্ঠান ছিল না, হয়ে উঠেছিল দুই ভিন্ন ধারার দুই স্রষ্টার নীরব আলাপ—একজন অঞ্জন দত্ত, আরেকজন লাকী আখান্দ। তখনও একে অপরের গান শোনা হয়নি, তবু সুরের ভাষায় তারা যেন আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। সেই মুহূর্তেই জন্ম নেয় এক অন্যরকম সঙ্গীত-অভিজ্ঞতা, যা পরে রূপ নেয় “একজন লাকী আখান্দ” নামের গানে।
পুরান ঢাকার এক সংগীতময় পরিবারে জন্ম তার। পিতা আবদুল আলী আখান্দ ছিলেন সংগীতচর্চার ভিত গড়ে দেওয়া এক নীরব কারিগর। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর হাত ধরেই লাকীর সংগীতজীবনের সূচনা। আর সেই পরিবারেই ছিলেন তাঁর সহোদর হ্যাপি আখান্দ, যিনি নিজেও ছিলেন আধুনিক বাংলা গানের এক উজ্জ্বল প্রতিভা। দুই ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল গভীর আত্মিক বন্ধনে বাঁধা—যেন একই সুরের দুই ভিন্ন অনুরণন।
কিন্তু ১৯৮৭ সালে হ্যাপি আখান্দের অকাল মৃত্যু লাকীর জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে। সেই শূন্যতা তাঁকে অনেকদিন গানের জগত থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। তিনি যেন নিজের ভেতরে গুটিয়ে যান, নীরব হয়ে যান সুরের জগৎ থেকে। তবু সময়ের ধৈর্য তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনে।
১৯৮৪ সালের পর থেকে তাঁর আনুষ্ঠানিক সংগীতযাত্রা শুরু হলেও, তার আগেই তিনি সুরের ভেতর নিজেকে গড়ে তুলছিলেন। লাকী আখান্দ ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, যিনি আধুনিক সংগীতের সঙ্গে লোকজ সুরের মিশ্রণে গড়ে তুলেছিলেন এক নতুন ভাষা। পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের সুরের সঙ্গে দেশীয় রাগ-অনুরাগকে তিনি এমনভাবে মিলিয়েছিলেন, যা তখনকার সময়ে ছিল এক নতুন বিস্ময়। তিনি সুরকে শুধু সাজাতেন না—তাকে জীবন্ত করে তুলতেন।
গিটার ছিল তাঁর নীরব সহচর। আঙুলের ছোঁয়ায় সেই তারগুলো যেন কথা বলত, কখনো হাসত, কখনো কাঁদত। তিনি ছিলেন মেলোডির জাদুকর—যিনি হামিং আর সূক্ষ্ম লয়ের খেলায় গানের ভেতর তৈরি করতেন এক অদ্ভুত আবেশ।
বাংলা সংগীতের ইতিহাসে তাঁর সৃষ্টি তালিকায় রয়েছে অসংখ্য অমর গান—“যেখানে সীমান্ত তোমার”, “আবার এল যে সন্ধ্যা”, “আমায় ডেকো না”, “কে বাঁশি বাজায় রে”, “আগে যদি জানিতাম”, “ভালোবেসে চলে যেয়ো না”—প্রতিটি গানই যেন আলাদা এক অনুভূতির দরজা খুলে দেয়। এই গানগুলো শুধু শোনা হয় না, বেঁচে থাকে মানুষের ভেতরে।
লাকী আখান্দের অ্যালবাম সংখ্যা সাতটির মতো হলেও, তাঁর প্রভাব কোনো সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সুর আধুনিক বাংলা গানের পথকে বদলে দিয়েছে। তিনি ছিলেন সময়ের অনেক এগিয়ে থাকা এক শিল্পী—যিনি ভবিষ্যতের সুরকে আগেই শুনতে পেতেন।
দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর বিদায় মানে শেষ নয়—বরং সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর আরও গভীর উপস্থিতি। কারণ লাকী আখান্দ এমন এক শিল্পী, যিনি চলে গেলেও সুরে থেকে যান, নিঃশ্বাসে থেকে যান, স্মৃতির গভীরে বেঁচে থাকেন।
আজও তাঁর গান বাজলে মনে হয়—কোথাও কোনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি গিটার বাজাচ্ছেন। পুরান ঢাকার কোনো অলিগলিতে, কিংবা সন্ধ্যার নরম আলোয়, তাঁর সুর যেন এখনো বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
“এই নীল মণিহার
এই স্বর্ণালি দিনে
তোমায় দিয়ে গেলাম
শুধু মনে রেখো”—
এই কয়েকটি পঙ্ক্তির ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে তাঁর জীবনের সারকথা। তিনি দিয়ে গেছেন সুর, অনুভব আর এক অনন্ত ভালোবাসা।
লাকী আখান্দ তাই শুধু একজন সংগীতশিল্পী নন—তিনি বাংলা গানের এক নীল মণিহার, যিনি আলো-ছায়ার ভেতর দিয়ে আজও আমাদের হৃদয়ে জ্বলে থাকেন নীরবে, গভীরভাবে, চিরকাল।