আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গাজায় শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করতে প্রায় বাধ্য করেছেন। কাতারে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যখন উথাল-পাথাল, তখন ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে কাতার সরকারের কাছে ক্ষমা চাইতে চাপ দিয়েছেন।
২০ দফা শান্তিচুক্তি অনুযায়ী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। দখলদারদের নেতা হিসেবে তিনি বুঝতে পারছিলেন, হঠাৎ হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি হুমকির মধ্যে ফেললে তার ক্ষমতা আরও দুর্বল হবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তা মেনে নিতে রাজি নয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার দ্রুত তেলআবিব সফর করেন, একমাত্র লক্ষ্য-নেতানিয়াহুকে চাপে রাখা।
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন, কিন্তু নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা করছেন। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র গঠনের অর্থ হামাসকে পুরস্কৃত করা, যা তার ক্ষমতা সংকটের কারণ হবে। সম্প্রতি জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠকে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন।
ইসরায়েলের নির্বাচন আগামী বছর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং গাজা যুদ্ধে ফলাফলের উপর নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নেতানিয়াহুর জন্য “রাজনৈতিক বিপর্যয়” হতে পারে। তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পরিবর্তে হামাসকে সম্পূর্ণ বিলুপ্তির দাবি করছেন।
গত মাসের শেষের দিকে ট্রাম্প ২০ দফা পরিকল্পনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু হামাস তাদের বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার পরও গাজায় সহিংসতা থামেনি। চলমান আলোচনা ইতিমধ্যেই ব্যাহত হওয়ার হুমকি তৈরি হয়েছে, যা দূর করতে মরিয়া ট্রাম্প প্রশাসন। গাজার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ট্রাম্পের শান্তিরক্ষী হিসেবে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমবর্ধমান সংকটাপন্ন। তার সরকার প্রধানত অতি-ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীদের সমন্বয়ে গঠিত, যারা মার্কিন চাপকে নেতানিয়াহুকে ফিলিস্তিনি পক্ষের সঙ্গে আপোষ করতে বাধ্য করার একটি রূপ হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের সংসদে নেতানিয়াহুর সমর্থকদের মধ্যে কয়েকজন তাকে গোপন সতর্কবাণী জারি করেছেন, যাতে পশ্চিম তীর দখল করতে উত্সাহ দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি এটি ঘটে ইসরায়েল সব ধরনের মার্কিন সমর্থন হারাতে পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, জেডি ভ্যান্স নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে হামাস নিরস্ত্রীকরণ, গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন এবং গাজা পুনর্গঠনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “ইসরায়েলি প্রশাসনের প্রতি আমাদের আশা হলো, তারা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপারে একমত হবে। হামাসকে নিরস্ত্র করার ক্ষেত্রে আমাদের নেতৃত্ব দেওয়া হবে। তাহলেই আন্তর্জাতিক বাহিনী কার্যক্রম সফল হতে পারবে।”
আল জাজিরার রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসরায়েলের চ্যানেল-১২-এর জরিপে দেখা যায়, ৫২% উত্তরদাতা মনে করেন, পরবর্তী নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রার্থিতা উচিত নয়। ৪২% মনে করছেন, লিকুদ পার্টির নেতা হিসেবে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হতে পারেন। বাকি ৭% অনিশ্চিত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইসরায়েলে মার্কিন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি দেশটিকে “শিশুপালনের” ভূমিকায় দেখায়। নেতানিয়াহু হয়তো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঠিক রাখতে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে চাইছে, আর যুক্তরাষ্ট্র তাকে থামাতে মরিয়া। নিউইয়র্কে নিযুক্ত প্রাক্তন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিঙ্কাস বলেন, “ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র। কোটি কোটি ডলার সাহায্য, জাতিসংঘে ওয়েটো ব্যবহারের ক্ষমতা এবং সামরিক সুরক্ষা-সবই ওয়াশিংটনের মাধ্যমে।”
টাইম ম্যাগাজিনে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নেতানিয়াহুকে গাজা যুদ্ধ চালানো থেকে বিরত রেখেছেন। নেতানিয়াহুর প্রাক্তন সহযোগী মিচেল বারাক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক উভয় দেশের নীতির কেন্দ্রবিন্দু, যা ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধের অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে।