আল আমিন বিশেষ প্রতিনিধিঃ
শেরপুর শহরের গৌরীপুর এলাকা, সদর উপজেলা:
বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো অটল দাঁড়িয়ে আছে এক শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা—‘মমিনবাগ’। শুধু একটি পুরনো বাড়ি নয়, এটি শেরপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের এক জীবন্ত সাক্ষী। এই বাড়িটিকে ঘিরে রয়েছে গল্প, স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং সময়ের পরিবর্তনের এক দীর্ঘ কাহিনি।
ইতিহাসের সূচনা: ভূঁইয়া বংশের ঐশ্বর্যের নিদর্শন
শেরপুরের গৌরীপুর এলাকায় একসময় বাস করতেন প্রভাবশালী ভূঁইয়া সম্প্রদায়ের জমিদাররা। তাঁদেরই একজনের হাতে গড়ে ওঠে এই মনোরম প্রাসাদ—যা পরবর্তীতে স্থানীয় ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। জমিদাররা ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সংস্কৃতিপ্রেমী। তাঁদের সৌন্দর্যবোধ ও রুচির প্রতিফলন ঘটেছিল বাড়ির নকশা, বাগান ও স্থাপত্যে।
দেশভাগের পর, ১৯৪৭ সালের অস্থির সময়টিতে ভূঁইয়া পরিবার ভারতে পাড়ি জমান। চলে যাওয়ার আগে তাঁরা বাড়িটি তাঁদের বিশ্বস্ত হিন্দু প্রজার কাছে রেখে যান। বহু বছর ধরে সেই প্রজারাই বাড়িটির যত্ন নেন, যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করেন ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে।
১৯৭৭ সালে শেরপুরের সম্মানিত নাগরিক মো. উসমান গণী ঐ হিন্দু প্রজার কাছ থেকে বৈধভাবে ক্রয় করেন পুরো বাড়িটি। বাড়ি ক্রয়ের পর শুধু মালিকানার পরিবর্তনই হয়নি—শুরু হয় এক নতুন যুগের সূচনা।
উসমান গণী বাড়িটির মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে অত্যন্ত যত্নে সংস্কার করেন। বাগানের চারপাশে নানা প্রজাতির ফুল, ফল ও শোভাগাছ লাগিয়ে বাড়িটিকে করে তোলেন এক শান্ত-সুশোভিত আবাসস্থল। তাঁর হাতেই ‘মমিনবাগ’ ফিরে পায় নতুন প্রাণ, নতুন রূপ।
‘মমিনবাগ’ নামের পেছনে অনুপ্রেরণার গল্প
উসমান গণীর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন মমিন সাহেব, যিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ, পরোপকারী ও সৎ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাড়িটির নামকরণ করা হয় ‘মমিনবাগ’।
এরপর থেকে ‘মমিনবাগ’ শুধু একটি নাম নয়—এটি হয়ে ওঠে এক আবেগ, এক পরিচয়, এক ঐতিহ্যের প্রতীক।
স্থাপত্যশৈলী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
দুই তলা বিশিষ্ট এই বাড়িটি নির্মিত হয়েছে ব্রিটিশ স্থাপত্যধারায়। উঁচু খিলান, চওড়া বারান্দা, লোহার নকশাদার রেলিং ও সিমেট্রিক জানালার সারি—সব মিলিয়ে এটি যেন এক প্রাচীন ইউরোপীয় স্থাপত্যকর্মের প্রতিচ্ছবি।
বাড়ির চারপাশে রয়েছে সবুজ গাছপালা, বাগানের পাশে একটি প্রাচীন দীঘি। সূর্যের আলোয় দীঘির জলে ঝিলমিল প্রতিফলন যেন সময়ের আয়নায় দেখা দেয় অতীতের স্মৃতি।
সংরক্ষণের দাবি ও পর্যটন সম্ভাবনা
আজও মমিনবাগের প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি বারান্দায় ইতিহাসের ছাপ স্পষ্ট। স্থানীয়রা বলেন—যদি এটি সরকারি বা পর্যটন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে মমিনবাগ হতে পারে শেরপুরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান।
ইতিহাসপ্রেমী ও স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য এটি হয়ে উঠতে পারে গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র। তাছাড়া, বাড়িটির অবস্থানও সুবিধাজনক—শেরপুর শহরের থানা মোড় বা নিউমার্কেট থেকে খুব অল্প সময়েই পৌঁছানো যায় গৌরীপুরের মমিনবাগে।
মমিনবাগ শুধুই একটি পুরনো বাড়ি নয়—এটি শেরপুরের আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসের অংশ। এখানে মিলেমিশে আছে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির উদাহরণ, ঐতিহ্য রক্ষার বার্তা, আর নান্দনিক স্থাপত্যের অনন্য সৌন্দর্য।
প্রতিটি ইট যেন বলে যায়—“সময় চলে যায়, কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়।”
আর সেই স্মৃতির নামই—‘মমিনবাগ’।