এই মহিমান্বিত রজনিতে মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সারা রাত নফল নামাজ আদায় করেন, কোরআন তেলাওয়াত করেন, জিকির-আযকার করেন এবং নিজেদের কৃত গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অনেকেই এ রাতে কবর জিয়ারতসহ বিভিন্ন ইবাদতে অংশ নেন।
কোরআন ও হাদিসে রমজানের কোন রাতটি লাইলাতুল কদর তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে কিছু নিদর্শন দেওয়া হয়েছে। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে বলেছেন।
রমজান মাসের ৩০ দিনের প্রথম ১০ দিন রহমতের, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাতের এবং শেষ ১০ দিন নাজাতের হিসেবে বিবেচিত। রহমত ও মাগফিরাতের দশক শেষ হওয়ার পর শুরু হয় নাজাতের দশক, যা রোজাদারদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময়েই মুসলমানরা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করেন। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এ রাতে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আল্লাহর অশেষ রহমত ও নিয়ামত লাভ করা যায় এবং এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
এ কারণে এই রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়াকে বড় দুর্ভাগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন, রমজান মাসের আগমনে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, “তোমাদের নিকট এই মাস সমাগত হয়েছে, এতে এমন একটি রাত রয়েছে যা এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে প্রকৃতপক্ষে সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। একমাত্র দুর্ভাগাই এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়।” সুনানে ইবনে মাজা: হাদিস নং ১৬৪৪।
শবে কদরের নামাজের নিয়ত
নামাজের নিয়ত আরবিতে বলা আবশ্যক নয়। তবে অনেকে আরবিতে নিয়ত করে থাকেন। নিয়তটি হলো— নাওয়াইতু আন উছাল্লিয়া লিল্লাহি তা’য়ালা রাকআতাই সালাতিল লাইলাতিল কাদরি নফলে মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শরীফাতি আল্লাহু আকবর।
শবে কদরের নামাজ পড়ার নিয়ম
লাইলাতুল কদরের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট নামাজের পদ্ধতি বর্ণিত হয়নি। এ রাতে দুই রাকাত করে যত মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে নফল নামাজ আদায় করা যায়, তা উত্তম। দুই রাকাত করে ইচ্ছামতো যত খুশি নামাজ পড়া যায়। এর পাশাপাশি বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা, দোয়া করা, ইস্তেগফার পড়া এবং তওবা করা উত্তম।
কিছু মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু সুরা পড়ার প্রচলন থাকলেও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো ভিত্তি নেই। তবে চাইলে বেশি বেশি সূরা কদর ও সূরা ইখলাস তেলাওয়াত করা যেতে পারে।
রমজানের শেষ দশকের যেকোনো বেজোড় রাতেই লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রত্যেক বেজোড় রাতে বেশি বেশি ইবাদত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ রাতে হাদিসে বর্ণিত একটি বিশেষ দোয়া বেশি পড়তে বলা হয়েছে।
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি জানতে পারি কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তাহলে কোন দোয়া পড়ব?” উত্তরে তিনি বলেন, তুমি বলো—
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি।
সূরা কদর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
‘ইন্না আনযালনাহু ফি লাইলাতিল কাদর। ওয়া মা আদরাকা মা লাইলাতুল কাদর। লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর। তানাযযালুল মালাইকাতু ওয়ার রূহু ফিহা বিইযনি রাব্বিহিম মিন কুল্লি আমর। সালামুন হিয়া হাত্তা মাতলা‘ইল ফাজর।’
অর্থ: শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। নিশ্চয়ই আমি এই কুরআন মহিমান্বিত কদরের রাতে নাজিল করেছি। আপনি কি জানেন, কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সে রাতে প্রত্যেক কল্যাণময় বিষয় নিয়ে ফেরেশতা ও রূহ (জিবরাঈল) তাদের প্রতিপালকের নির্দেশে অবতীর্ণ হন। সে রাত শান্তিময়, যা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।