নিউজ ডেস্ক :
রাজনৈতিক সংস্কার ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার রূপরেখা দিতে ঘোষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এর খসড়া নিয়ে স্পষ্ট মতবিরোধে জড়িয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলো। বিএনপি খসড়াটিকে ইতিবাচক বলে স্বীকৃতি দিলেও জামায়াতে ইসলামী একে অসম্পূর্ণ ও বিপজ্জনক আখ্যায়িত করেছে। অন্যদিকে নাগরিক ঐক্য পার্টি (এনসিপি) সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত না হলে তা প্রত্যাখ্যানের হুমকি দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ২১তম দিনের আলোচনা সভায় এসব অবস্থান উঠে আসে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “জুলাই সনদের খসড়ায় যে অঙ্গীকারগুলোর কথা বলা হয়েছে, তাতে আমরা একমত। কোনো শব্দগত বা বাক্যচয়নের সংশোধন প্রয়োজন হলে তা দেব। এমনকি আগামী দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তাবেও আমাদের সমর্থন রয়েছে।”
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “সনদটি অসম্পূর্ণ এবং কিছু অংশ রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। বিশেষ করে নির্বাচনের পরবর্তী দুই বছর সরকারকে সংস্কারের সময় দেওয়ার প্রস্তাব আমাদের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। যদি এমন খসড়া চূড়ান্ত হয়, আমরা তা গ্রহণ করব না।”
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “জুলাই সনদকে অবশ্যই লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। মৌলিক সংস্কারের প্রতিটি বিষয় এতে থাকতে হবে। তা না হলে, দলের অভ্যন্তরীণ ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সই করব কিনা।”
প্রস্তাবিত খসড়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটির কথা বলা হয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় বিচারপতিদের যুক্ত করা নিয়ে দ্বিধা দেখা দিয়েছে।
বিএনপি মনে করে, কমিটি যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করতে হবে।
জামায়াত বলেছে, বিচারপতিদের যুক্ত করলে নিরপেক্ষতা আরও বাড়বে, এবং সংসদের মতামতের ওপর নির্ভর করাটা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনে ‘ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি’তে ১০০ আসন বরাদ্দের পরিবর্তে, বিএনপি ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, যা ধাপে ধাপে ১০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়। তবে জামায়াতসহ ছয়টি ধর্মভিত্তিক দল এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি।
জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সনদের বাস্তবায়নে দু’টি পথ রাখা জরুরি, অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনি কাঠামো এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন।
দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন বলেন, “কমিশনের খসড়া হঠাৎ প্রকাশ করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যথার্থ নয়। আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। আইনি কাঠামোর নিশ্চয়তা না পেলে ‘জুলাই সনদ’ প্রত্যাখ্যান করবে এনসিপি।”
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, চূড়ান্ত আলোচনায় অগ্রগতি হবে।
গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান বলেন, “খসড়ায় কেবল ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন আছে, ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন নেই, এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, “প্রায় সব ইস্যুতে ঐকমত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছি। ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর আর কোনো আলোচনা হবে না।”
এই দ্বিধা আর মতভেদ সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে কমিশনের আশাবাদ টিকে আছে, একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় সনদের মধ্য দিয়ে আগামী নির্বাচন ও সংস্কারের পথচিত্র স্পষ্ট হবে কি না, তা নির্ধারিত হবে আসন্ন দিনে।