আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যখন বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কৃষি ও জ্বালানি খাতে মনোযোগ বাড়াচ্ছে, তখন ভারতের কৃষি বাজারে মার্কিন আগ্রাসী অবস্থান নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়, যা সরাসরি চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শুল্ক যুদ্ধ ভারতের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে একটি সংকট তৈরি করছে। কারণ ভারতের কৃষিপ্রধান অর্থনীতি ও কৃষক শ্রেণি দেশটির অন্যতম বড় ভোট ব্যাংক, যাদের ক্ষুব্ধ করা মানে নির্বাচনী বিপর্যয় ডেকে আনা।
কৃষিপণ্য নিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘদিনের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্য ছিল ১৩১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে ভারত রপ্তানি করেছে ৮৬.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর আমদানি করেছে ৪৫.৩ বিলিয়ন ডলার।
এই অসমতা সবচেয়ে প্রকট কৃষিপণ্যে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত আমদানি করেছে ১.৬৯৩ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩.৪৭২ বিলিয়ন ডলারের। ফলে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ভারতের বাজারে আরও প্রবেশাধিকার পেতে, আর তার জন্য চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হচ্ছে এই শুল্ক।
নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে কৃষকদের সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই উত্তপ্ত। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই উত্তেজনার প্রতিফলন দেখা গেছে, যেখানে কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলোতে বিজেপি বড় ধাক্কা খায়। উদাহরণস্বরূপ, মহারাষ্ট্রে ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল ২৩টি আসন, যা ২০২৪ সালে নেমে আসে মাত্র ৯টিতে। হরিয়ানায় পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে নেমে আসে অর্ধেকে। পাঞ্জাবে একটি আসনও পায়নি বিজেপি।
এই ফলাফল মোদিকে সতর্ক করেছে। তাই সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেছেন, কৃষক, খামারি ও জেলেদের স্বার্থে তিনি আপস করবেন না। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, অন্যদিকে কৃষকদের ভোট, এই দ্বিমুখী চাপে কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন মোদি।
বাণিজ্য চাপের আরেকটি খাত হচ্ছে জ্বালানি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত যেন রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমায়। কিন্তু নয়াদিল্লি জানিয়ে দিয়েছে, ১৪০ কোটির জনগণের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা বজায় রাখবে।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ফারা আমের মনে করেন, এই দ্বন্দ্ব নিছক অর্থনৈতিক নয়, বরং এর পেছনে ভূরাজনৈতিক সমীকরণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে কিনা, এই প্রশ্ন এখন মোদির সামনে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
ক্যালিফোর্নিয়ার মিডলবারি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রবার্ট রোগোভস্কির বিশ্লেষণ মতে, দুই দেশ উত্তেজনার মাঝেও সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাবে। ভবিষ্যতে হয়তো ‘অত্যন্ত সৃজনশীল কূটনীতি’র মাধ্যমে উভয় পক্ষই সমাধানের পথ খুঁজে নেবে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।
ভারতের কৃষি বাজারে প্রবেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং মোদির কৌশলগত প্রতিরোধ ভবিষ্যতের বাণিজ্য সম্পর্ক ও নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষকের ভোট এবং বৈদেশিক চাপের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে মোদি যেভাবে কৌশল নিচ্ছেন, তা শুধু আগামী নির্বাচনের নয়, উপমহাদেশের ভূরাজনীতির ভবিষ্যতও নির্ধারণ করতে পারে।