পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকার যানজট কমাতে প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলে পর্যায়ক্রমে বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প সড়ক সংযোগের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি বলেন, বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত শুনেছেন এবং পুলিশ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
অটোরিকশা চলাচলে ধাপে ধাপে বিধিনিষেধ:
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ প্রথমে মতিঝিল থেকে উত্তরা ও গাবতলী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রধান ভিআইপি করিডোরগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করবে।
এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রধান সড়ক এবং শেষ পর্যায়ে রাজধানীর অলিগলিতেও এই বিধিনিষেধ কার্যকর করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
বিধিনিষেধ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার আগে শহরজুড়ে অটোরিকশার চার্জিং পয়েন্টগুলোতে অভিযান চালাতে পারে পুলিশ। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, অনেক অটোরিকশা চার্জিং গ্যারেজ অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে। নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমেও এগুলোর কোনো কোনোটি নিয়ন্ত্রিত হয়।
তিন পর্যায়ের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা:
যানজট নিরসনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগটি তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।
প্রথম ধাপে ভিআইপি সড়কগুলো থেকে অবৈধ অটোরিকশা সরিয়ে নেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে চার্জিং পয়েন্টগুলোকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হবে এবং অটোরিকশার খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে নিরুৎসাহিত করা হতে পারে।
চূড়ান্ত পর্যায়ে পুরো শহরজুড়ে এই অভিযান জোরদার করা হবে। তবে অটোরিকশা বা চালকদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই লক্ষ্যে চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজ মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান।
রাজধানীকে যানজটমুক্ত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ডিএমপি ইতিমধ্যে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ফুটপাতগুলো পুরোপুরি পরিষ্কার হওয়ার পরেই অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনা অনুযায়ীই অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিকল্প রুটের সন্ধান:
রাজধানীর প্রধান প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলোতে যানজট কমাতে বিকল্প রুট ব্যবহারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে ডিএমপি।
এর মধ্যে একটি প্রস্তাবে পূর্বাচল থেকে বনশ্রী পর্যন্ত একটি সড়ক সংযোগের কথা বলা হয়েছে। এটি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অভ্যন্তরীণ রাস্তা ব্যবহার করে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্বদেশ প্রপার্টি ও আফতাবনগরের পাশ দিয়ে সংযোগ তৈরি করবে।
ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ট্রাফিক) মিজানুর রহমান টিবিএসকে বলেন, ডিএমপি কর্মকর্তা ও রাজউক প্রকৌশলীরা যৌথভাবে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করেছেন।
তিনি বলেন, সরেজমিনে পরিদর্শনকালে কর্মকর্তারা সড়কের অবস্থা, ট্রাফিকের চাপ, সংযোগ সক্ষমতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো খতিয়ে দেখেছেন।
মিজানুর রহমান আরও বলেন, ‘এই রুট বাস্তবায়িত হলে তা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাবে এবং যানজট কমিয়ে গণপরিবহনের সক্ষমতা বাড়াবে।’
নীতিগত প্রেক্ষাপট ও বিগত প্রচেষ্টা
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সরকার অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তারা বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বিগত অন্তর্বর্তী সরকার রাজধানীসহ সারা দেশে এই যানবাহনগুলো নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু সেসব প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ট্রাফিক শৃঙ্খলার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সরকার প্রথমে ঈদের পর সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলতে না দেওয়ার কথা ভেবেছিল। এ লক্ষ্যে সারা দেশে একটি জরিপ চালানো হয় এবং অটোরিকশা, মালিক, গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টের তালিকা তৈরি করা হয়।
জরিপের ফলাফল ও অবকাঠামো:
পুলিশের জরিপ অনুসারে, সারা দেশে এখন প্রায় ৩৮ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে, যার সঙ্গে প্রায় ৪৩ লাখ শ্রমিক জড়িত।
জরিপে উঠে এসেছে, এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই প্রায় ৩০ লাখ অটোরিকশা চলাচল করে। আর রাজধানীতে প্রায় ৩৩ লাখ চালক আছেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, এর সাথে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জীবনজীবিকা জড়িত থাকায় অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীতে ১৬,১৪৮টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জিং পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২,২৮৭টি আওয়ামী লীগ, ৬৮৮টি বিএনপি, ১৪টি জামায়াত, ৩০টি শ্রমিক দল এবং ৫০টি কৃষক দলের সাথে যুক্ত এবং ১৩,০৭৯টি স্বতন্ত্র।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, এই স্থাপনাগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বিদ্যমান রেগুলেটরি কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হচ্ছে।
অফিশিয়াল বক্তব্য:
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, যানজট নিরসনে কর্তৃপক্ষ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও ডিএমপির সাথে বৈঠক করেছেন। আমরা পরিকল্পনা তৈরি করেছি এবং সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা হুট করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ করব না। এতে মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শ্রমিক ও মালিকরা রাজপথে নেমে আসতে পারে। আমরা ধাপে ধাপে এগোব।’
খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, চার্জিং পয়েন্টগুলোকেও পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রণে আনা হবে এবং এই যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ কর্তৃপক্ষ নেবে না।
খালিদ রিয়াজ \ বাংলাদেশ নিউজ টুডে