মাদারীপুর সংবাদদাতা :
গভীর রাত। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে শুভ। মাথা ও চোখে অসহনীয় যন্ত্রণা। চোখ দুটি বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখলেও শরীরজুড়ে ১৯০টিরও বেশি ছররা গুলির ক্ষত যেন ক্রমশ তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
মাদারীপুরের চর কুকরাইলের ২০ বছরের তরুণ শুভ বেপারী একাদশ শ্রেণির ছাত্র। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ‘জুলাই আন্দোলনে’ অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। আজ তার চোখে আলো নেই, মাথার ভেতরে রয়ে গেছে ৫৬টি ছররা গুলি। চিকিৎসার ব্যয়বহুল যুদ্ধে হারিয়ে গেছে পারিবারিক সহায়-সম্পদ। ভেঙে পড়েছে সংসার। শুধু শরীর নয়, অভাব-অনটনের হাহাকারেও জর্জরিত এখন এই যোদ্ধার পরিবার।
শুভ বলেন, “চোখে কিছু দেখতে পাই না, মাথার যন্ত্রণা সহ্য হয় না। রাতের বেলা ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠি। বেঁচে আছি, কিন্তু কোথায় যেন থমকে গেছে আমার জীবন।” তার শরীরে অপারেশন করে কিছু গুলি বের করা গেলেও চোখ ও মাথার গুলিগুলো থেকে যায়। অপারেশনের জন্য প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা। কিন্তু সেই অর্থ নেই পরিবারে। সরকারি জায়গায় থাকা ছোট মুদি দোকানটিও উচ্ছেদ করে দিয়েছে প্রশাসন। বিক্রি হয়ে গেছে শেষ সম্বল ৫ লাখ টাকার জমি। এখন বাবা-ছেলে দুজনেই বেকার।
শুভর মা লিপি বেগম চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “রাতে ছেলের কষ্ট দেখে বুকটা ফেটে যায়। আর পারি না। আমাদের তো আর কিছু নেই, শুধু ছেলেটাকে বাঁচিয়ে রাখার আকুতি ছাড়া।”
বাবা সোহেল বেপারী বলেন, “আমার এখন কোনো কাজ নেই। ছেলে চোখে দেখতে পায় না, অসহ্য কষ্টে দিন কাটে। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমার ছেলের যেন উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, আর আমাদের পরিবারকে একটা পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হয়।”
শুভ জানান, “সরকার বলেছিল আমাদের চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেওয়া হবে, কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি। শুধু টাকা দিলে হবে না, সুচিকিৎসা আর পুনর্বাসন দরকার।”
জুলাই আন্দোলনে আহতদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের। যদিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মাদারীপুর জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আশিকুল তামিম আশিক জানান, “আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সরকার আহতদের ক্যাটাগরি অনুযায়ী সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে।”
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, “আহত প্রত্যেক পরিবারকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনা হবে। সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।”
তবু শুভর চোখে এখনো আলো ফেরেনি। অপেক্ষা শুধু একজন নাগরিক হিসেবে তার বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত হওয়ার। তার একান্ত প্রার্থনা, “দৃষ্টি ফিরে পেতে চাই। আবার আলোর মুখ দেখতে চাই। শুধু নিজের জন্য নয়, আমার মা-বাবার মুখে হাসি ফেরাতে চাই।”
শুভ বেপারী যেন কোনো রাজনৈতিক গল্পের নয়, বরং এ দেশের এক নিঃশব্দ সংগ্রামী তরুণের নাম। যে চোখে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সেই চোখই আলো হারাতে বসেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখন শুধু আর্থিক সহযোগিতা নয়, বরং এই নিঃস্ব, আহত তরুণটির পাশে দাঁড়িয়ে তার মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা, এটাই হোক সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা।