বিনোদন ডেস্ক: বাংলাদেশ নিউজ টুডে
চলচ্চিত্র এক অদ্ভুত জগৎ। এখানে নায়ক জন্মান কেবল মঞ্চের আলোয় নয়, জন্মান নিয়তির গোপন লেখায়। কেউ আসেন দীর্ঘ সাধনার সিঁড়ি বেয়ে, কেউ আসেন আত্মপ্রকাশের সুনিপুণ পরিকল্পনায়। আর কেউ কেউ আসেন একেবারেই অনভিপ্রেতভাবে, যেন ভাগ্য তাদের বেছে নেয় হঠাৎ করেই। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক আলমগীর সেই শেষের দিককার উদাহরণ। তাঁর আবির্ভাব ছিল আকস্মিক বজ্রঝলক, আর স্থায়িত্ব ছিল নক্ষত্রের মতো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম যার আলোয় ভিজেছে।
ঢাকার তেজগাঁও স্টেশন রোডের এক পুরনো বাড়ি, চারদিকে বৃক্ষছায়া, আঙিনার উপর নেমে আসে গ্রীষ্ম দুপুরের আলো, ঘরের কোণে জমে থাকা শৈশবের স্মৃতি। সেই বাড়িতেই থাকতেন আলমগীরদের দাদা। আর হঠাৎ একদিন সেই গৃহে ভাড়াটিয়া হয়ে আসেন প্রখ্যাত পরিচালক আলমগীর কুমকুম।
একদিন উঠোনে চোখে পড়ল এক তরুণ। তার মুখে ছিল অদ্ভুত দীপ্তি, চোখে যেন লুকানো রূপকথার ভাষা। পরিচালক থমকে দাঁড়ালেন। মনে হলো, এই তরুণের ভেতরে আছে পর্দার জন্য জন্মানো এক আভিজাত্য, যা আলাদা করে চিনিয়ে দেয় নিয়তির বিশেষ সন্তানকে।
সেদিন থেকেই লেখা হলো এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।
অভিনেতার কন্যা আঁখি আলমগীর সম্প্রতি ফিরে গেছেন সেই বাড়ির স্মৃতিচারণায়। তাঁর চোখে ভেসে উঠেছে এল-শেপড বাড়ির লম্বা করিডর, ছাদের চুপিচুপি ওঠা দুপুর, বাথটাবে শিশুর হাসি, গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে হাওয়া খেলার সুর।
আজ সেই জায়গায় উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট দাঁড়িয়ে আছে। নগরায়ণের ঠাসবুনোটে হারিয়েছে আগের নির্জনতা। তবু আঁখির কাছে সেখানে গেলে এখনও ভেসে আসে অতীতের বাতাস— যেন দেয়ালের ইটপাথরে জমে থাকা স্মৃতি ফিসফিস করে বলে, “এখানেই জন্ম নিয়েছিল এক নায়ক।”
আলমগীরের বাবা কলিম উদ্দিন আহম্মেদ (দুদু মিয়া) ছিলেন ঐতিহাসিক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’–এর অন্যতম প্রযোজক। সেই ছবি বাংলা চলচ্চিত্রকে শোনায় প্রথম সবাক সংলাপের শব্দ। রক্তের ভেতরে হয়তো তাই আগে থেকেই বয়ে চলছিল সিনেমার ধারা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আলমগীরের অভিনয়ে আসা ঘটল পুরোপুরি ভিন্ন পথে, যেন পূর্বপুরুষের রোপণ করা বীজ একদিন অচেতনেই অঙ্কুরিত হয়ে উঠল।
১৯৭৩ সাল। আলমগীর কুমকুম তৈরি করলেন এক নতুন ছবি- ‘আমার জন্মভূমি’। অতএব তরুণ আলমগীরের হাতে এল ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রথম সুযোগ। তাঁর চোখে তখনও ছিল সরলতার স্বচ্ছতা, কণ্ঠে ছিল অনভ্যস্ত অথচ আন্তরিক আবেগ। দর্শকরা যেন প্রথম দেখাতেই বুঝে ফেলল, নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো ঢালিউডে।
সময়ের গতি যখন নব্বই দশকে এসে দাঁড়াল, তখন বাংলার সিনেমাহলে যেন এক অলিখিত সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো-
“আলমগীর আছেন মানেই সিনেমা সফল।”
তিনি একদিকে প্রেমিক, যাঁর আবেগে ভিজেছে নায়িকাদের চোখ; অন্যদিকে পরিবারের কর্তা, যাঁর চরিত্রে খুঁজে পেত দর্শক পিতার স্নেহ। কখনো তিনি বিদ্রোহী যুবক, কখনো স্নিগ্ধ স্বামী, সর্বত্রই অদ্ভুত স্বাভাবিকতা আর মানবিক উষ্ণতায় দর্শকের মন জয় করেছেন। আলমগীর শুধু চরিত্রে অভিনয় করতেন না, তিনি চরিত্রকে রক্তমাংসের মতো জীবন্ত করে তুলতেন।
সময় কেটে যায়। নতুন প্রজন্ম আসে। তবু আলমগীরের নাম উচ্চারিত হলে এখনও দর্শকের চোখে ভেসে ওঠে সোনালি পর্দার দিনগুলো। কন্যা আঁখি আলমগীর তাঁর সংগীতের মাধ্যমে বয়ে নিয়ে চলেছেন বাবার উত্তরাধিকার।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনেকে এসেছেন, অনেকেই মিলিয়ে গেছেন। কিন্তু আলমগীর থেকে গেছেন স্থায়ী আসনে- কিংবদন্তি হিসেবে।
ভাবলে বিস্ময় লাগে, যদি সেই তেজগাঁওয়ের বাড়িতে আলমগীর কুমকুম ভাড়াটিয়া হয়ে না আসতেন, যদি তাঁর চোখে ধরা না পড়ত সেই তরুণ, তবে হয়তো বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস অন্যরকম হতো।
কিন্তু নিয়তির কলম একদিন লিখেছিল ভিন্ন গল্প। কাকতালীয় এক মুহূর্তে জন্ম নিল এক কিংবদন্তি- “নায়ক আলমগীর”।
তিনি প্রমাণ করে গেলেন, বড় গল্পগুলো কখনো কখনো শুরু হয় একেবারেই হঠাৎ, একেবারেই আকস্মিক কোনো দরজা দিয়ে।
“আলমগীর” তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন। তিনি বাংলা সিনেমার আবেগ, এক যুগের প্রতীক, আর ভাগ্যের অলৌকিক আহ্বানে জন্ম নেওয়া এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।