ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন গুঞ্জন—ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচন। দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন হওয়ার জোর সম্ভাবনা থাকলেও মাঠের লড়াই যে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক শক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তা এখন মোটামুটি স্পষ্ট। আর এই লড়াইয়ে সংসদীয় আসনের গাণিতিক হিসাব, তৃণমূলের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও আগাম প্রচারণার রণকৌশল—তিন দিক থেকেই অনেকটা এগিয়ে আছেন জামায়াতের প্রার্থী, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
অন্যদিকে, ভোটের আর মাত্র তিন-চার মাস বাকি থাকলেও বিএনপি এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি, শুরু হয়নি দৃশ্যমান কোনো প্রচারণাও।
নির্বাচন কবে? কী বলছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন?
গত ১৯ মে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন, বর্ষা মৌসুমের ধকল কেটে গেলে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে ঢাকার দুই সিটিসহ দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও জোর প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও পুনর্নির্ধারণের কাজ জুন-জুলাইয়ে শেষ হবে। আগস্টে তফসিল ঘোষণা করে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের এই নির্বাচনী ক্যালেন্ডার সামনে আসার পরই জামায়াত পুরোদমে প্রচারণায় নেমেছে; বিপরীতে বিএনপির নেতাকর্মীরা এখনো দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পুরো ভৌগোলিক সীমানা জাতীয় সংসদের আটটি আসন (ঢাকা-১১ থেকে ঢাকা-১৮) নিয়ে গঠিত। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ৮ আসনের মধ্যে ৫টিতেই জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের নির্বাচনী মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জয়লাভ করেছে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যেখানে প্রতিটি ওয়ার্ডের সংসদীয় ভোটব্যাংক মেয়র পদের জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখে, সেখানে ৮টির মধ্যে ৫টি আসনে নিজেদের সংসদ সদস্য থাকা একটি বিশাল গাণিতিক ও সাংগঠনিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
পরাজিত আসনেও ভোটের গভীর সমীকরণ
যে তিনটি আসনে জোট সরাসরি জিততে পারেনি, সেখানেও জামায়াতের ভোটভিত্তি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী।
ঢাকা-১৩ আসনে (মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর) জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক অত্যন্ত সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হন। ২০১৫ সালের সিটি নির্বাচনে এই এলাকার সংরক্ষিত নারী আসন থেকে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী কাওছার জাহান কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন, যা এ অঞ্চলে জামায়াতের সামাজিক ভিত্তির জানান দেয়।
ঢাকা-১৭ আসনে (গুলশান, বনানী, মহাখালী) জামায়াতের প্রার্থী এস. এম. খালিদুজ্জামান শেষ মুহূর্তে অল্প ভোটে পরাজিত হন। গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় এত বিপুল ভোট পাওয়া নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।
ঢাকা-১৮ আসনে (উত্তরা, খিলক্ষেত, বিমানবন্দর) শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তনের কারণে জোট আসনটি ধরে রাখতে পারেনি। তবে মাঠপর্যায়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য বলছে, শুধু এই আসনেই জামায়াতের ৪ হাজারেরও বেশি ‘রোকন’ (শপথধারী পূর্ণকালীন সদস্য) এবং প্রায় অর্ধলক্ষাধিক কর্মী-সমর্থক রয়েছেন। সিটি নির্বাচনের মতো বিশাল আয়োজনে এই সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী বুথ ব্যবস্থাপনায় নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে।
জোটে ‘একক’ নির্বাচনের হাওয়া, জামায়াতের প্রস্তুতি গোছানো
সংসদ নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নিলেও আসন্ন সিটি নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের মধ্যে এখনো আনুষ্ঠানিক আসন সমঝোতা হয়নি। তবে জামায়াত ইতোমধ্যেই সব জায়গায় একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ করেছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমঝোতা নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। আমরা আপাতত সব জায়গায় নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ করছি।’
দলের অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, দুই সিটিতেই কয়েকজনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে, শিগগিরই ঘোষণা আসবে। অর্থাৎ, জামায়াত প্রার্থী নিয়ে দ্বিধায় নেই; বরং তারা পুরোদমে একক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে।
সেলিম উদ্দিনের আধুনিক প্রচারণা ও বিএনপির মাঠশূন্যতা
ভোটের রাজনীতিতে ‘যে আগে মাঠ দখল করে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে সে এগিয়ে থাকে’—এই প্রবাদ এখন ঢাকা উত্তরের বাস্তবতা। জামায়াতের একক প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন গত কয়েক মাস ধরে অলআউট প্রচারণা চালাচ্ছেন। তার কৌশল প্রথাগত রাজনৈতিক সভার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ‘প্লাস্টিকের বোতল জমা দিলে বিনামূল্যে গাছের চারা’ দেওয়ার ১০ দিনব্যাপী ক্যাম্পেইন, কোরবানির হাটে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিনামূল্যে হাজার হাজার বিশেষ পলি ব্যাগ বিতরণ, সর্বশেষ ১২ জুন এক বর্ণাঢ্য সাইকেল র্যালি—এসবের মাধ্যমে তিনি সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি করছেন। নাগরিক সেবা অ্যাপ উন্মোচনের মতো প্রযুক্তিবান্ধব উদ্যোগও তাঁকে নগরবাসীর কাছে ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপন করছে।
পক্ষান্তরে, বিএনপি এখনো তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেনি, ফলে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো প্রচারণা শুরু হয়নি। দলের নেতাকর্মীদের মুখে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন তাবিথ আউয়াল (পরীক্ষিত মুখ), বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং উত্তর বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ কাইয়ুম। তবে এই তিনজনের কেউই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারে নামেননি।
ত্যাগী বনাম কর্পোরেট ইমেজ: মনোনয়ন জটিলতায় বিএনপি
সিটি নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইকে ঘিরে বিএনপির ভেতরেও চলছে টানাপোড়েন। তৃণমূলের নেতারা চাইছেন, দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হোক। হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দুঃসময়ে যারা নেতাকর্মীদের পাশে ছিল, তাদের সিটি নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া উচিত।’ কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমদ ফাহিম বলেন, ‘রাজধানীর স্থানীয় বাসিন্দা, দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের পাশে থাকবেন—এমন কাউকে মনোনয়ন দেওয়া উচিত।’ কিন্তু দলের স্থায়ী কমিটির নেতারা বলছেন, তফসিল ঘোষণার আগে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে না। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘পার্টির সিদ্ধান্তই মুখ্য।’
এক পক্ষ এগিয়ে, অন্য পক্ষ দ্বিধায়
ভোটের আর মাত্র তিন-চার মাস বাকি। একদিকে সংসদীয় আসনের গাণিতিক সমীকরণ, সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী, আগাম ও আধুনিক প্রচারণার মাধ্যমে জামায়াতের সেলিম উদ্দিন ঢাকা উত্তরের মেয়রপদের দৌড়ে স্পষ্ট এগিয়ে। অন্যদিকে, বিএনপির এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি, শুরু হয়নি প্রচার, আর অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন-জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সব মিলিয়ে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী দাবার বোর্ডে এখন পর্যন্ত একক আধিপত্য বিস্তার করে আছেন জামায়াতের প্রার্থী—বাকিটা নির্ভর করছে বিএনপির পরবর্তী কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর। সোর্স:বাংলা পোস্ট