মো:জাকির হোসেন নীলফামারী প্রতিনিধি :
নীলফামারীর সৈয়দপুরে সড়ক ও ফুটপাত করে বসানো অবৈধ দোকান উচ্ছেদে অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। যানজট নিরসন ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল নিশ্চিত করতে চালানো এই অভিযানের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। এতে দীর্ঘ ৫ ঘন্টা চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় সর্বস্তরের মানুষকে। দোকানদাররা এসময় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বেলা ২ টায় শহরের শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়কে এই ঘটনা ঘটেছে।
জানা যায়, সৈয়দপুর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহা ফাতেহা তাকমিলার নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়। এতে পৌর প্রশাসনের কর্মচারীরা সহযোগিতা করেন। বেলা ২ টার দিকে বিউটি সাইকেল স্টোরের সামনে থেকে একটা ফলের দোকান সরাতে গেলে বাধা দেওয়া হয়। এসময় বিউটি সাইকেল স্টোরের কর্মচারীদের সাথে পৌর কর্মচারীদের বাক বিতন্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
পৌর কর্মচারীদের অভিযোগ সৈয়দপুরবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে এবং যানজটের দুর্ভোগ লাঘব করতে উচ্ছেদ চলাকালে বিউটি সাইকেল স্টোরের মালিক ও সৈয়দপুর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেনসহ তার কর্মচারীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ৪ জন পৌর কর্মচারী আহত হলে অন্যান্যরা এগিয়ে এসে প্রতিরোধ করে। এসময় হামলাকারী ৪ জনকে আটক করে পৌরসভায় নিয়ে যাওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে আলতাফ হোসেন উচ্ছেদের শিকার অবৈধ দোকানদার ও তার কর্মচারীদের ডেকে রাস্তা অবরোধ করেন।
অবরোধের সময় শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়কের মদীনা মোড় থেকে রেলগেট পর্যন্ত সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রেলগেটের বার নামিয়ে দিয়ে এবং মদীনা মোড়ে বাঁশ ও রোড ডিভাইডারের সিমেন্টের বার দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসময় নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনে বক্তব্য রাখেন আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, পৌর কর্মচারীরা জোরপূর্বক আমার দোকানে ঢুকে হামলা করে। আমার কর্মচারীরা বাধা দেওয়ায় চেষ্টা করলে তারা সন্ত্রাসীদের মতো বেদম মারপিট করে এবং জোর করে টেনে হিঁচড়ে আহত ৩ জনকে ধরে নিয়ে যায়। যেতে যেতে আরও বেধড়ক মারধর করেছে।
তিনি আরও বলেন, পথে বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে দোকানে আসার সময় আরেক কর্মচারী এই দৃশ্য দেখে প্রতিবাদ করলে তাকেও কলার ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায়। চোর মারার মতো অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে আমার কর্মচারীরা। এই অন্যায়ের প্রতিবাদেই আমরা রাস্তায় নেমেছি। আটক করে নিয়ে যাওয়া ৪ জনকে ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই পৌর কর্মচারীরা ফুটপাতের গরীব দোকানীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে খায়। ইতোপূর্বে তাদের এই অবৈধ কাজের প্রতিবাদ করার কারণেই তারা আজ উচ্ছেদের অজুহাতে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এর সুষ্ঠু বিচার দাবী করেন তিনি।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার, সাধারণ সম্পাদক শাহীন আক্তার শাহিন, সহ সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন পাপ্পু, সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার প্রামাণিক,সৈয়দপুর প্রেসক্লাবের আহবায়ক বিএনপি নেতা শওকত হায়াৎ শাহ এবং নীলফামারী জেলা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সহ সভাপতি আলহাজ্ব ইমতিয়াজ আহমেদ উদ্যোগ নেন। তাঁরা অবরোধকারীদের নেতা আলতাফ হোসেনের সাথে আলোচনা করে পৌরসভায় আসেন এবং উভয় পক্ষের কথা শুনে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে রাত ৯ টায় সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান।
এসময় আহত পৌর কর্মচারী কাজী মিঠু, রায়হান বলেন, আলতাফ সাহেব উচ্ছেদের সময় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করাসহ তার কর্মচারীদের লেলিয়ে দেন আমাদের বিরুদ্ধে। সরকারি কাজে বাধা দিয়ে এবং মারপিট করে উল্টো ঘটনা ধামাচাপা দিতে মবের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি যানজট নিরসন কমিটির সেক্রেটারি হয়েও নিজ দোকানের সামনের অবৈধ ফল দোকান উচ্ছেদে বাধা দিয়েছেন। এমন দ্বিচারিতা খুবই উদ্বেগজনক। এর সঠিক বিচার না হলে তিনি আবারও আমাদের উপর অন্যায়ভাবে নির্যাতন করবেন।
রেলগেটে আটকে পড়া একজন অসুস্থ ব্যক্তি চিৎকার করে বলেন, আমি ওষুধ নিতে এসে ফেঁসে গেছি। দয়া করে আমাকে মোটর সাইকেল নিয়ে যেতে দেন। কিন্তু কেউ তার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করায় অবরোধকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের সাথে পৌর কর্মচারীরা অন্যায় করে থাকলে সেখানে যান, বিচার চান। এভাবে আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ভোগান্তিতে ফেলেছেন কেনো। আপনাদের আচরণই বলে দিচ্ছে পৌর প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ভালো কাজই করছিল। কিন্তু আপনারা হিনস্বার্থে জনভোগান্তি সৃষ্টি করেছেন।
আরেক ব্যক্তি বলেন, প্রতিবারই উচ্ছেদ অভিযানকালে পুরো শহরে কোন সমস্যা হয়না। কিন্তু বিউটি সাইকেল স্টোরের সামনের ফল দোকানটা নিয়ে জটিলতা শুরু হয়। আলতাফ হোসেন এতো বড় লোক ও দায়িত্বশীল মানুষ। অথচ তিনিই যানজট নিরসনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। তার এই ফল দোকানের কারণেই মূলতঃ চরম যানজট হয় ওই এলাকায়। উচ্ছেদের শিকার ক্ষুদ্র ও ফেরিওয়ালা ব্যবসায়ীরা তার দোকান উচ্ছেদ না হওয়ার উদাহরণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এবং প্রশাসনের সদিচ্ছাকে কটাক্ষ করেন। ফলে সড়ক ও ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ ও স্থায়ীভাবে যানজট মুক্ত করা সম্ভব হয়না।
এব্যাপারে পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারহা ফাতেহা তাকমিলার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোন কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পৌর প্রশাসক ও ব্যবসায়ীদের সাথে উপজেলা হল রুমে রাত ৯ মিটিংয়ে বসার কথা রয়েছে।
মো:জাকির হোসেন
নীলফামারী প্রতিনিধি