ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি :
একটি ফোনকল।
মাত্র কয়েক মিনিটের শব্দদূষণ।
তবু সেই কণ্ঠস্বরের রুক্ষতা, সেই গালিগালাজের বিষ, সেই হুমকির আগুন, একজন শিক্ষকের ঘরবাড়ি, হৃদয়, এমনকি শিশুসন্তানের নিদ্রাও কেঁপে ওঠে তার তীব্রতায়।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নে চিলাউড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এমদাদুল হক, যিনি প্রতিদিন শিশুদের হাতে তুলে দেন স্বপ্নের খাতা, কলম আর মূল্যবোধের গল্প, তিনি আজ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
কারণ, একটি ফোনকলেই তিনি শুনেছেন:
“তোরে পিটাইমু, তোর কোনো বাপে ফিরাইতো পারতো না… কিছুদিনের মধ্যে পিটা খাইবি, অপেক্ষা কর।”
এই ভয়ংকর হুমকি এসেছে স্থানীয় বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ডা. রাজা মিয়ার কণ্ঠে। সেই কণ্ঠ এখন ভাইরাল, শব্দগুলো ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, আর তাতে কেঁপে উঠেছে একটি পুরো জনপদ।
প্রধান শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ের মাঠে সরকারি বরাদ্দে মাটি ভরাটের কাজ চলছিল। নিয়মমাফিক উপজেলা প্রশাসনের অনুমোদন নিয়েই কাজটি শুরু হয়। কিন্তু সেখানে বাধা দেন ডা. রাজা মিয়া। পরবর্তীতে প্রশাসনের সহযোগিতায় কাজ শেষ হলেও নেতার অসন্তোষ রয়ে যায়।
এর কিছুদিন পরই এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট জানানো হয়নি, এমন অজুহাতে ফোন করে শুরু হয় গালিগালাজ, অপমান আর হুমকির তাণ্ডব। শুধু ফোনেই নয়, অভিযোগ রয়েছে তার নাতিকে পাঠিয়ে স্কুলে হুমকি দেওয়াও হয়।
প্রধান শিক্ষক বলেন, “আমি আমার একজন সহকারী শিক্ষককে নিয়ে গিয়ে তাঁর দোকানে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও দুর্ব্যবহার ও অপমানিত হতে হয়। আজ আমি শুধু একজন শিক্ষক নই, আমি এক আতঙ্কগ্রস্ত বাবা। আমার ছোট সন্তান পর্যন্ত রাতে ঘুমাতে পারে না।”
একজন শিক্ষক, যিনি রাষ্ট্রের বর্ণমালা নির্মাণ করেন, তাঁর মুখে এমন বাক্য সমাজের জন্য এটা শুধু লজ্জার নয়, এক ভয়ংকর সংকেত।
জগন্নাথপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ের একাডেমিক সুপারভাইজার অরূপ কুমার রায় জানান, “বিষয়টি রেকর্ডসহ আমাকে জানিয়েছেন। আমি তাকে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরকত উল্যাহ বলেন, “প্রধান শিক্ষক চাইলে তিনি আইনি সহায়তা পাবেন। প্রশাসন তাঁর পাশে থাকবে।”
এদিকে, অভিযুক্ত ডা. রাজা মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোন এখন বন্ধ, হোয়াটসঅ্যাপেও কোনো উত্তর মেলেনি।
একটি ভয়েস রেকর্ড, একটি ফোনকল।
তাতে ভেঙে গেছে একজন শিক্ষকের নির্ভরতার বেষ্টনী, তার সন্তানের নিদ্রা, আর আমাদের সমাজের বিবেক।
একটি প্রশ্ন এখন চারপাশে ঘুরছে,
একজন শিক্ষক যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে শিক্ষিত জাতি কীভাবে গড়ে উঠবে?