নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে বাড়ছে লোডশেডিং, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে সেখান থেকে বর্তমানে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে এই খাত থেকে।
এদিকে জ্বালানির অভাবে দেশের ৩০ থেকে ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গরমের শুরুতেই বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও উৎপাদন সীমাবদ্ধ রয়েছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। এতে করে প্রতিদিনই ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা পূরণ করতে বাধ্য হয়ে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরু থেকেই লোডশেডিং বাড়লেও রাজধানী ঢাকায় প্রথমদিকে এর প্রভাব তুলনামূলক কম ছিল। তবে গত বুধবার থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
গাজীপুর, কুষ্টিয়া, নাটোর, নোয়াখালী, রাজবাড়ী ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দিন-রাত দফায় দফায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। টঙ্গী, কোনাবাড়ী ও কালিয়াকৈর এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার কারখানায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প মালিকরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। এতে রপ্তানি আদেশ পূরণ এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
জেলার পরিস্থিতির চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ১৬ থেকে ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৫ থেকে ৭ মেগাওয়াট। ফলে দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। নাটোরে দিনে-রাতে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে। সন্ধ্যায় ১৫৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯৩ মেগাওয়াট।
নাটোরের লালপুরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৬ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। নোয়াখালীতে ৯ লাখের বেশি গ্রাহকের বিপরীতে চাহিদার তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের হাতে পাখা দিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে। জেনারেটরের অভাবে চিকিৎসা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না।
হবিগঞ্জে চাহিদা ১৮ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট। ফলে দিনভর লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। সিলেট, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, সুনামগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এখন জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।