• সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০৫:০৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ইউক্রেনে রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলা, নিহত ৯ ১৬ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য নতুন দায়িত্ব পেলেন আন্দালিব রহমান পার্থ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন নিয়ে সভা করলেন প্রধানমন্ত্রী বন্ধ হচ্ছে যুদ্ধ: চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজে উত্তেজনার মধ্যেই ওমান উপকূলে ডুবলো ভারতীয় জাহাজ নোয়াখালীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান: দুই ফিড মিলকে জরিমানা নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে চায় ইরান তিউনিসিয়ার রক্ষণভাগে ধস, ৫-১ গোলে সুইডেনের দাপুটে জয় ​ভোলাহাটে বিজিবির অভিযানে ৯৬ বোতল ভারতীয় নেশাজাতীয় সিরাপ উদ্ধার

গাজায় তামাকের বদলে শাকপাতায় নিকোটিন!

প্রতিবেদক / ৫ বার
আপডেট : রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

গাজা সিটির কেন্দ্রস্থলে ধুলোমাখা এক সড়কের পাশে ছোট্ট একটি অনানুষ্ঠানিক বাজার। দুই পাশে অস্থায়ী দোকানে বিক্রেতারা সাজিয়ে রেখেছেন শুকনো মলুখিয়া পাতার বড় বড় প্লাস্টিকের ব্যাগ, পাশেই পড়ে আছে কয়েকটি তামাকের প্যাকেট।

মলুখিয়া—জুট ম্যালো নামের এক উদ্ভিদের পাতা—সাধারণত ঘন ঝোলজাতীয় খাবার রান্নায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু গাজার এই দোকানগুলোতে এখন এটি ব্যবহার হচ্ছে ‘মলুখিয়া সিগারেট’ বানাতে।

আলা জুনদিয়া (২৭) একজন বিক্রেতার কাছ থেকে একটি চাইলেন। বিক্রেতা এক মুঠো শুকনো পাতা আঙুলের মধ্যে গুঁড়ো করে তাতে এক ফোঁটা তরল নিকোটিন মেশালেন। এরপর মিশ্রণটি পাতলা কাগজে মুড়ে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন। ছয় বছর ধরে ধূমপান করা আলা বর্ণনা করলেন, কীভাবে ইসরায়েলের যুদ্ধ আর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি তার অভ্যাসকে জোর করে বদলে দিয়েছে।

‘একটা তামাকের সিগারেটের দাম এখন ১০০ শেকেল (৩৪ ডলার)… এটা পাগলামি,’ মলুখিয়ার আলাদা গন্ধমাখা ধোঁয়া ছেড়ে বললেন তিনি। ‘এখন আর তামাকের মতো লাগে না… কিন্তু উপায় না থাকায় এটাই ব্যবহার করছি।

এটা বিকল্প নয়, শুধু প্রয়োজন

দুই সন্তানের বাবা আলা যুদ্ধের শুরুতেই কাঠমিস্ত্রির চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। এখন এক প্যাকেট সিগারেটও তাঁর জন্য অসহনীয় আর্থিক বোঝা।

‘যুদ্ধের আগে আমরা সব ধরনের তামাক, আমদানি করা ব্র্যান্ড চেখে দেখেছি। এখন যা শুকিয়ে রোল করতে পারি, তাই ধূমপান করছি। এটা কোনো বিকল্প না—এটা শুধু প্রয়োজন,’ বললেন তিনি।

মলুখিয়া সিগারেট বানানো হয় পাতা শুকিয়ে ও গুঁড়ো করে, তারপর ধূমপানের উপযোগী করতে তাতে নিকোটিন মিশিয়ে। কোনো নিরাপত্তা মানদণ্ড নেই, আছে শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি।

চিকিৎসকদের সতর্কতা: ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিতকরণ না থাকলেও শ্বাসতন্ত্র ও হৃদরোগ বিভাগের কয়েকজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, মলুখিয়া সিগারেট সেবনের সঙ্গে শ্বাসরোধ, শ্বাসকষ্ট ও মুখের রং বদলে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে রোগীরা আসছেন।

কান, নাক ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ পরামর্শক চিকিৎসক ডা. আহমেদ সাঈদ আল-জাদবা সতর্ক করে বলেছেন, ‘মলুখিয়া পোড়ানো সাধারণ তামাকের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’

তিনি ব্যাখ্যা করেন, শুকনো মলুখিয়ায় যোগ করা তরল নিকোটিন ক্যানসার-সৃষ্টিকারী একটি পরিচিত উপাদান। কিছু ক্ষেত্রে কীটনাশক বা ব্যাটারির তেলের মতো শিল্প-রাসায়নিকও মেশানো হয়, যা মিশ্রণটিকে অত্যন্ত বিষাক্ত করে তোলে।

‘এসব পোড়ানোর সময় কার্বন মনোক্সাইড ও টারের মতো বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এগুলোই ক্যানসার ও কোষের ক্ষতির মূল কারণ,’ বললেন তিনি। ক্লিনিকে আসা অনেক রোগীর কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া, কালো বা হলুদ কফ, এমনকি স্বরযন্ত্রে ক্যানসারের পূর্বাবস্থার ক্ষতও শনাক্ত হয়েছে বলে জানান এই চিকিৎসক।

আল্লাহর রহমতে বেঁচেছি

আলার নিজেরও নিকোটিন নিয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। একবার পকেটে রাখা নিকোটিনভর্তি সিরিঞ্জ ভেঙে ত্বকে লাগায় তীব্র জ্বালা আর চার ঘণ্টার অচেতনতার শিকার হন তিনি।

‘আমি নিকোটিনভর্তি সিরিঞ্জ পকেটে রাখতাম। হঠাৎ ভেঙে নিকোটিন ত্বকে লেগে যায়। ভয়াবহ দগ্ধ হয়েছিলাম, টিস্যুর ভেতরেও ঢুকে গিয়েছিল। আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেছি,’ স্মরণ করলেন তিনি। স্থানীয় বাজারে নিকোটিনের ভুল ব্যবহারে গুরুতর আহত এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও শুনেছেন বলে জানালেন।

ঝুঁকি জেনেও আসক্তি আর অর্থনৈতিক চাপে ধূমপান ছাড়তে পারছেন না আলা। ‘গাজার মতো কঠিন অবস্থায় মানসিক চাপ কমাতে ধূমপান দরকার… কিছুটা মুক্তি পেতে। আমাদের জীবনে আর কী আছে যা ক্ষতিকর নয়?’ তিক্ত কণ্ঠে বললেন তিনি।

তামাক থেকে মলুখিয়া: ব্যবসায়ীদের গল্প

আবদুল করিম হেলেস (৩৬) দীর্ঘদিনের তামাক বিক্রেতা। শুজাইয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখন গাজা সিটির পশ্চিম অংশে থাকেন।

‘যুদ্ধের আগেও তামাকের ব্যবসা করতাম, যুদ্ধের সময়ও করেছি। আমার আর কোনো পেশা নেই,’ বললেন তিনি। কিন্তু সিগারেটের আকাশছোঁয়া দামের কারণে ক্রেতারা এখন নিকোটিন মেশানো নানা ভেষজের দিকে ঝুঁকছেন, যার মধ্যে মলুখিয়া সবচেয়ে জনপ্রিয়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ভেষজের সঙ্গে কাঁচা নিকোটিন ব্যবহার বিপজ্জনক… এটা বিষাক্ত, মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।’ বাজারে সম্প্রতি দুজন নিকোটিন নেওয়ার পরপরই মারা গেছেন বলে জানালেন তিনি।

তবে মলুখিয়া এত জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কারণ আছে—‘নিকোটিন সব ভেষজে লাগে না। মলুখিয়া এটাকে ধরে রাখে… তাই সতর্কতার পরও এটি এত ছড়িয়ে পড়েছে।’

একটা প্যাকেটের দাম এখন ৬০০ শেকেল

ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় তামাকজাত পণ্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। খাদ্য ও মানবিক সহায়তা প্রবেশেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, যা গত বছর দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছিল।

অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরু হলে নিষেধাজ্ঞা তোলার কথা থাকলেও ইসরায়েল গাজায় কী ঢুকতে পারবে, তা সীমিতই রেখেছে।

আলা বলেন, ‘একটা প্যাকেট আগে ১৫ শেকেল (৫.১৫ ডলার) ছিল, এখন ৫০০ বা ৬০০ শেকেল (১৭১-২০৫ ডলার) পর্যন্ত পৌঁছেছে। অনেকের কাছেই এখন সিগারেট কেনা প্রায় অসম্ভব।’

একক সিগারেটও বিক্রি হচ্ছে বর্ধিত দামে, যা ক্রয়ক্ষমতার ভয়াবহ পতনেরই প্রতিফলন।

কোনো বিকল্প নেই

৪০ বছর বয়সী হাসান হুজান ২০১৭ সাল থেকে ধূমপান করছেন। এখন তিনিও কিনছেন মলুখিয়া সিগারেট।

‘সত্যি বলতে, আমি স্বাস্থ্যের জন্য ভয় পাই… কিন্তু যা পাওয়া যাচ্ছে, তা আদতে কোনো বিকল্পই নয়,’ বললেন তিনি। প্রতিদিন সকালে শ্বাসকষ্ট আর বুকভর্তি কালো কফ নিয়ে ঘুম ভাঙে তার। কয়েকবার ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করেও আসক্তির চাপে ফিরে গেছেন। অবিরাম মানসিক চাপ আর সিগারেটের অভাব তাকে আরও রাগী ও খিটখিটে করে তুলছে।

গাজার লাখো মানুষের মতো হাসানও শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। কবে জীবন স্বাভাবিকতার কোনো রূপে ফিরবে, জানেন না।

‘আমার চার সন্তানকে ঠিকমতো খাওয়াতে পারি না… অবস্থা দমবন্ধ করা। শুজাইয়ায় বাড়ি হারিয়েছি, এখন ভয়াবহ অবস্থায় এক তাঁবুতে আছি,’ বললেন তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও

ফেসবুকে আমরা