শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই আমলের পরপর দুই মেয়াদে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের একটি ভিডিও ভাইরাল নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, তিনি নেচে নেচে গান গাইছেন আর তাতে তাল দিচ্ছেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার কয়েক সদস্য থেকে শুরু করে উপস্থিতি তারকা অতিথিরা।

কথিত আছে, ঘটা করে খাল-নদী দখল মুক্তের অভিযান পরিচালনা করলেও, কাজের চেয়ে সাবেক মেয়র আতিক গান গাইতেন বেশি। বড় বড় জনসভা কিংবা অনুষ্ঠানে গান গেয়ে চমক দেখাতেন ঢাকা উত্তরের সদ্য সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ নেত্রীর অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে কোন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে মেয়র আতিকের গাওয়া বহু গানের ভিডিও এখনও সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকে অন্য অনেকের মতো লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান মেয়র আতিক। শেষে গত ১৬ অক্টোবর রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএস এলাকা থেকে আতিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরের দিন মোহাম্মদপুর থানার তিনটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতে নেওয়া হয়। সেখানে জামিন নামঞ্জুর করে আতিককে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
ধরা পড়ার সময় সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামকে এক ভিন্ন রূপে দেখা যায়। তার সাধারণ চেহারার সঙ্গে মিলছিলো না বর্তমান রূপটি- কালো গোঁফ সাদা হয়ে গেছে, মুখ ভর্তি ছিলো কাঁচাপাকা দাঁড়ি। তার এই চেহারা চিরাচরিত পরিচিত রূপ থেকে একেবারেই ভিন্ন। তবে, তার পোশাকে ছিলো বিলাসিতার ছাপ- পরনে ছিলো পাশ্চাত্যের দামি ব্র্যান্ড ভলকমের একটি টি-শার্ট। তাও তাকে উদভ্রান্ত, উসকোখুসকো দেখা যায় ছবিতে।
মেয়র হিসেবে জনসেবার চেয়েও ব্যতিক্রমী আয়োজনে জনগণকে মাতিয়ে রাখাই ছিলো তার অন্যতম কাজ। তাইতো কোথাও গান, কোথাও অভিনয় দেখিয়ে মাধ্যমে চেষ্টা করেছেন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের। নানান সব আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিজেকে কিছুটা মানবিক বা জনদরদী হিসেবেও বেশ প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন আতিক। যদিও পালিয়ে যাওয়ার পর বেরিয়ে এসেছে তার এই মানবিকতার মুখোশের আড়ালের চিত্র।
শিক্ষার্থী-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে গেলো ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও নিজের সিন্ডিকেটের বেশ কিছু কর্মচারী ও সাংবাদিক নিয়ে ১৮ আগস্ট গোপনে নগর ভবনে প্রবেশ করেন আতিক। নিয়ে যান বহু কাগজপত্র। তার এই লুকোচুরির কারণ খুঁজতে গিয়ে একের পর এক বেরিয়ে আসতে শুরু করে শত কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য।
গেলো বছর কোরবানি ঈদের সময় ছাগলকাণ্ডে দেশব্যাপী আলোচনায় আসে মোহাম্মদপুরের সাদিক এগ্রো। ওই সময় খালের ওপর গড়ে ওঠা খামারটি উচ্ছেদ করলেও জানা যায়, সাদিক এগ্রো থেকে কোটি টাকার গরু কিনেছে মেয়র আতিকের ভাতিজা শাকের। উঠে আসে সাদিক এগ্রোর ব্যবসায় মেয়র পরিবারের সম্পৃক্ততার তথ্যও। অভিযোগ আছে, নিজের সম্পৃক্ততার তথ্য লুকাতেই তড়িঘড়ি করে খামারটি উচ্ছেদ করেন আতিক।
ঐচ্ছিক তহবিলের নামে ৫ বছরে ৩৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম। এখনো এই ৩৭ কোটি টাকার বড় অংশেরই হিসাব পাওয়া না গেলেও এর মধ্যে মাত্র ১ কোটি ৬০ লাখ ৬৫ হাজার টাকার হিসাব পাওয়া গেছে নগর প্রশাসনের কাছে। নিজের এপিএস এর সংগঠন বিডি ক্লিনকে দুই ধাপে সাড়ে ১২ লাখ টাকাসহ আতিক নিজের পছন্দের ব্যক্তি ও সংগঠনকে বিলিয়েছেন নগরবাসীর টাকা।
অভিযোগ আছে, সিটি কর্পোরেশনের সব ক্ষেত্রেই ছিল মেয়রের স্বেচ্ছাচারিতা। মনমতো পদ বানিয়ে নিজের আত্মীয় স্বজনদের বসিয়েছেন সিটির বিভিন্ন পদে। অভিজ্ঞতা না থাকলেও মেয়রের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন ভাতিজা ইমরান আহমেদকে। শুধু উত্তর সিটি এলাকার জন্য বানিয়েছেন চিফ হিট অফিসার নামে নতুন পদ। এই পদে বসিয়েছেন নিজের মেয়েকে। এই নিয়ে এখনও আলোচনা তুঙ্গে।
তখন সাবেক এই মেয়র বলেছিলেন, বিনা বেতনেই কাজ করবেন এই হিট অফিসার। সরকার পতনের পর বিনা বেতনের আসল রহস্য উন্মোচিত হয়। বিনা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিজের মেয়ে বুশরা আফরিনকে চীফ হিট অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মাসে আট লাখ টাকা বেতন দিতেন বলে অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে আগের সব প্রথা ভেঙে প্রথমবারের মতো কর্মকর্তা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে মুন্সীগঞ্জের একটি ব্যয়বহুল রিসোর্টে অনুষ্ঠিত হয় ডিএনসিসির বোর্ড সভা। সেখানে ডিএনসিসির সব কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা দুদিন অবস্থান করেন। সেখানে সবমিলিয়ে সিটি কর্পোরেশনের তহবিল থেকে খরচ করা হয়েছে ৬৪ লাখ ৮১ হাজার ২৬৫ টাকা।
শুধু রিসোর্টে বোর্ড সভা বা বনভোজন নয়, জাতীয় শোক দিবস, মেট্রোরেল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, জেলহত্যা দিবসের আয়োজনের ব্যয়ের পুরোটাই দেখানো হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটির সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন খাত থেকে। ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে শেখ হাসিনার বনানী কবরস্থানে আগমন উপলক্ষ্যে ঢাকা উত্তর শুধু প্যান্ডেল, গেট, লাইট বাবদ খরচ দেখিয়েছে ৪৯ লাখ ১১ হাজার ৬৮০ টাকা।
এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে খরচ দেখানো হয়েছে ৪০ লাখ ৩০ হাজার ৬৮১ টাকা, মেট্রোরেল উদ্বোধন উপলক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি এলাকায় ব্র্যান্ডিং সংক্রান্ত কাজ বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ টাকা। এসব অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে ভুয়া ভাউচার বানিয়ে বড় অঙ্কের টাকা তুলে নিয়েছেন সাবেক মেয়র আতিকের ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা।
শ্যালিকার প্রতিষ্ঠান শক্তি ফাউন্ডেশনকে দিয়ে করিয়েছেন নগর এলাকার বৃক্ষরোপণের কাজ, ভাগনেকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছেন সব ঠিকাদারির কাজ। সবচেয়ে বেশি লুটপাট করেছেন এপিএস ফরিদ উদ্দিনের মাধ্যমে। তার বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচার বানিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাটের নথিপত্র পাওয়া গেছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, আতিকের লোপাট করা অর্থ আবারও ফিরবে সিটি কর্পোরেশনের তহবিলে।