তারই অংশ হিসেবে প্রথমে আগামীকাল ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন তারেক রহমান। সেখান থেকে সরাসরি আগামী ২৩-২৬ জুন চার দিনের চীন সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত-চীন বিতর্ক এড়িয়ে সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রথমে মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে শ্রমবাজার ও এফটিএ চুক্তি। পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও দেশটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই দুই দেশ সফরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, তারেক রহমানের চীন সফরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় প্রধানত চীনা বিনিয়োগ ও সফট লোনের বিষয় প্রাধান্য পাবে। এ ছাড়া আলোচনায় প্রাধান্য পাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা ব্যারাজ, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), বেসামরিক ও সামরিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ প্রসঙ্গ।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে কেন্দ্র করে ১৪ থেকে ১৬টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। এসব চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া সফরের অংশ হিসেবে আগামী ২৫ জুন বেইজিংয়ে ‘ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি উচ্চ পর্যায়ের বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য থাকবে চীনা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
জানা যায়, ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার মিশন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম থাকবেন বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফর দুই দেশের মধ্যকার বোঝাপড়া, সম্পর্ক ও অংশীদারিকে আরো শক্তিশালী করবে এবং কৌশলগত সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন অঙ্গীকারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বেইজিং সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করে রাজনৈতিক, কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে আলোচনা করবেন।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, ‘এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে রপ্তানি বাজার ও স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, যার প্রায় ২৫ শতাংশ আমদানি আসে দেশটি থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল, কাপড়, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানিতে চীনের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে।’
বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী পরিচালক আবু তাহের বলেন, ‘চীনের কয়েকটি বড় কম্পানির সঙ্গে আমাদের ব্যবসায়ীদের এরই মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কথাবার্তা হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন নীতিগত ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত সরকার পর্যায়ে নির্ধারণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি পলিসি এবং ডিপ্লোমেটিক আলোচনার ওপর নির্ভর করছে।’
বর্তমানে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান চীনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের মোট বৈদেশিক প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণ করা অর্থের মধ্যে ৩০ বিলিয়ন ডলার এসেছে অনুদান হিসেবে এবং বাকি ১১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের পর থেকে চীনা ঋণের প্রবাহ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯-২০২৩ সালের মধ্যে চীন প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার বিতরণ করেছে, যা এ পর্যন্ত চীনের মোট ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ। গত পাঁচ-ছয় বছরে বাংলাদেশে চীনা ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ এই সময়ে ঋণ বিতরণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
চীনে কাজ করা সাবেক বাংলাদেশি কূটনীতিকের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং জ্বালানির সংকটের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরে আগামী বছর চীনের কাছ থেকে উচ্চ মাত্রার সফট লোনের প্রতিশ্রুতি আশা করা যায়। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০২৩-২৪ সময়কালে চীন বাংলাদেশকে ১০,২৯১.৮৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের বৈদেশিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং একই সময়ে ৬,৫৪১.৯৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনা নেতারা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্প, চীনা বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা সংকট, মায়ানমারের গৃহযুদ্ধসহ আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ ধরনের ব্যাপকভিত্তিক সংলাপের উদ্দেশ্য, দুই দেশের বহুমুখী সম্পর্ককে আরো জোরদার করা।
সূত্র জানায়, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ কমাতে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজ চাইতে পারে। প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং বাংলাদেশে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর অনুপ্রবেশ বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলস্বরূপ ঢাকা এই সংকট সমাধানে বেইজিংকে সক্রিয় উদ্যোগের অনুরোধ জানাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি উত্থাপন করবে এবং চীনা উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগের আহবান জানাবে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।
বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর মতো বিষয়গুলো বিশেষভাবে সামনে এসেছে। চীন যেহেতু প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতায় অগ্রসর একটি দেশ, তাই বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে চায়। তবে একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো, চীনও শুধু লাভজনক ও টেকসই প্রকল্পেই আগ্রহ দেখাবে। তারা সব প্রস্তাবে সাড়া দেবে এমন নয়।’
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে প্রায় ৫০০ একর জমিতে চীনা শিল্প জোন বা ইকোনমিক জোন এরই মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ বর্তমানে চীন থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে, কিন্তু রপ্তানি করে মাত্র ৬৮০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই বড় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চীন বাংলাদেশকে প্রায় ১০০টি পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে যেসব বাংলাদেশি শ্রমিকের বৈধ কাগজপত্র নেই, তাঁদের বৈধতা দেওয়া এবং শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত করে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানিতে সব বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর বাইরে বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি শিক্ষার্থী যেন দেশটিতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য যেতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে দুই দেশের সরকারেরই আগ্রহ রয়েছে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ বলেন, ‘সফরটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তবতা হলো, এটি খুবই স্বল্প সময়ের সফর। আমার জানামতে, পুরো সফরের সময় ৩০ ঘণ্টার মতো। প্রস্তুতির সময়ও খুব কম। ফলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বা বেসরকারি খাতের ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ কম। সূত্র: কালের কণ্ঠ