নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত হাওরাঞ্চল ঘিরে কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও হাওরের মানুষ যুগের পর যুগ অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন।
রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘হাওরের দুর্যোগ: চাষাভুষার সন্তান’ গ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা ও করণীয় শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে নেত্রকোণা সাংবাদিক ফোরাম-ঢাকা।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, হাওরাঞ্চল নিয়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেগুলো অনেক সময় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বাস্তবায়ন করা হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গেও সমন্বয় করা হয় না—যা কার্যকর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তিনি হাওরের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানান।
নিজের শেকড়ের কথা তুলে ধরে কায়সার কামাল বলেন, তিনি হাওরের মাঝেই জন্ম ও বেড়ে উঠেছেন। ছোটবেলা থেকেই হাওরের মানুষের কষ্ট, সংগ্রাম ও বঞ্চনার চিত্র তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। কৃষক ও চাষিরা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, কিন্তু তাদের জন্য স্থায়ী সমাধানমূলক উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, “যখন ক্ষতি হয়, তখনই শুধু হাওর নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ অনুপস্থিত।”
সেমিনারে তিনি হাওরের মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগও তুলে ধরেন। তার মতে, লিজ ব্যবস্থার কারণে প্রভাবশালী মহল হাওরের সম্পদ দখল করছে, ফলে প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি বিলের মধ্যে অবৈধভাবে গর্ত করে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা এবং কৃষকদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, “কৃষকের ধান ৪৩ কেজিতে এক মণ ধরে কম দামে কেনা হচ্ছে—এটি সিস্টেমেটিক শোষণের অংশ, যা জাতীয়ভাবে সমাধান করা দরকার।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি সংসদ সদস্য ডা. আনোয়ারুল হক বলেন, হাওর দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও দুর্নীতির কারণে অনেক প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে।
অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলেন, হাওরের সংকট কেবল প্রাকৃতিক নয়; বরং অপরিকল্পিত বাঁধ, ভুল কৃষিনীতি, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও নির্বিচার উন্নয়নের ফলেও এই সংকট তৈরি হচ্ছে। তিনি নদী খনন, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং স্থানীয় কৃষকদের সম্পৃক্ত করে টেকসই পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র গঠন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষক ও উৎপাদনশীল সমাজকে অবমূল্যায়ন করে রাষ্ট্র এগোতে পারে না।
সেমিনারে বক্তারা হাওর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানান। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।