আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে হরমুজ প্রণালী হয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছিল কাতার। সেই জ্বালানি সম্পদই ছোট এই উপসাগরীয় রাষ্ট্রটিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তবে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে, আঞ্চলিক অস্থিরতার মুখে সেই সমৃদ্ধি কতটা ভঙ্গুর।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কাতারের জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের হামলার কারণে দেশটির গ্যাস রপ্তানি কার্যত দুই মাসের বেশি সময় ধরে স্থবির হয়ে আছে। গ্যাসনির্ভর অর্থনীতির দেশ কাতার এখন ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।
দেশটির প্রধান শিল্প ও জ্বালানি কেন্দ্র রাস লাফানে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে কাতারের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথগুলোও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। রাজধানী দোহার দক্ষিণে অবস্থিত হামাদ বন্দরেও এখন নীরবতা বিরাজ করছে; পণ্য ওঠানামার ক্রেনগুলো প্রায় অচল অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এই যুদ্ধ শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, কাতারের বহুমুখী অর্থনৈতিক কৌশলেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটন তীব্রভাবে কমে গেছে। ফলে রাজধানীর হোটেল, বিপণিবিতান ও বিলাসবহুল বিপণিকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। বহুজাতিক অনেক প্রতিষ্ঠানও অঞ্চলটিতে নিজেদের কার্যক্রম সীমিত করতে শুরু করেছে।
যুদ্ধের আগে কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বার্ষিক ৭ কোটি ৭০ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ১২ কোটি ৬০ লাখ টনে উন্নীত করা হবে।
কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় রাস লাফান স্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে গেলেও এই ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ইতোমধ্যেই কয়েকশ কোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আশঙ্কা করছে, চলতি বছর কাতারের অর্থনীতি প্রায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেন, কাতারের অর্থনৈতিক কাঠামো মূলত বিদেশি বিনিয়োগ, প্রবাসী শ্রমিক ও স্থিতিশীলতার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। আর এশিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হেলালের মতে, জ্বালানি সম্পদের শক্ত ভিত্তি ছাড়া কাতারের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোর অনেক কিছুই সম্ভব হতো না।
যদিও কাতারের হাতে এখনো বিপুল আর্থিক রিজার্ভ এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার্বভৌম সম্পদ তহবিল রয়েছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর অবরোধ দেশটির অর্থনীতির দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
একসময় উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মডেল হিসেবে বিবেচিত কাতার এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা একসঙ্গে ভেঙে পড়লে বিপুল সম্পদও দ্রুত চাপে পড়ে যেতে পারে।