সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ নামটি শুধু একটি প্রশাসনিক পরিচয় নয়; এটি উত্তরবঙ্গের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মারক। জনশ্রুতি ও স্থানীয় ইতিহাস অনুসারে, প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত পীর সিরাজউদ্দিন আউলিয়ার নামানুসারেই এ অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে ‘পীরগঞ্জ’। সেই ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী পীরডাঙ্গী গোরস্থান আজ যখন ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পরিণত হওয়ার অভিযোগে আলোচনায় আসে, তখন বিষয়টি শুধু পরিবেশ দূষণের নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের সংকট হিসেবেও সামনে আসে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতাই তাদের কবরস্থান ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। মিসরের পিরামিড থেকে শুরু করে ভারতের সুফি দরগাহ কিংবা বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক মাজার ও গোরস্থান এসব স্থান কেবল মৃত মানুষের শেষ আশ্রয় নয়, বরং একটি সমাজের স্মৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের ধারক।
পীরগঞ্জের পীরডাঙ্গী গোরস্থানও তেমনই একটি স্থান। এখানে শুধু সাধারণ মানুষের কবরই নেই; রয়েছে একটি অঞ্চলের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতির ধারাবাহিকতা। অথচ অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে পৌর এলাকার বর্জ্য এনে এই কবরস্থানের আশপাশে ফেলা হচ্ছে। ফলে দুর্গন্ধ, পরিবেশ দূষণ এবং পবিত্রতার অবমাননার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের অবহেলার ঘটনা নতুন নয়। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে দেশের বিভিন্ন পৌর এলাকায় পরিকল্পনাহীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বহু খাল, জলাশয় এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে জনসচেতনতা ও প্রশাসনিক উদ্যোগে অনেক জায়গায় পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও এখনও অনেক এলাকায় টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব রয়ে গেছে।
পীরডাঙ্গী গোরস্থানের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো এর নিরাপত্তাহীনতা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত সীমানা প্রাচীর, আলোকসজ্জা ও নজরদারির অভাবে রাতের অন্ধকারে অসামাজিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ ২০২২ সালে এই গোরস্থান থেকে একাধিক কবর খুঁড়ে কঙ্কাল চুরির ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন কোনো ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় স্থান অরক্ষিত থাকে, তখন সেখানে অপরাধী চক্রের সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো একটি সমাজ তার মৃতদের কতটা সম্মান দেয়? কারণ মৃতদের প্রতি আচরণই অনেক সময় জীবিতদের সভ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে। ইসলামী ঐতিহ্যে কবরস্থানকে সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। একইভাবে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও কবরস্থান সংরক্ষণ জনস্বার্থ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচিত।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক বার্তা। তবে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা আরও তাৎক্ষণিক। তাদের দাবি, স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত কবরস্থানে বা তার আশপাশে বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং চারদিকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
পীরগঞ্জের ইতিহাস শুধু অতীতের গৌরব নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি দায়িত্বও বটে। পীর সিরাজউদ্দিন আউলিয়ার স্মৃতিধন্য এই গোরস্থান যদি অবহেলা ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে তার মর্যাদা হারায়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি কবরস্থান নয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে পীরগঞ্জের ঐতিহাসিক পরিচয়ও। তাই এখন প্রয়োজন অভিযোগ-প্রতিআরোপ নয়, বরং দ্রুত, কার্যকর এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটির মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা।