নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় দেশকে পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময়।
রোববার (৭ জুন) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। আমরা অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াব, ইনশাআল্লাহ।” তিনি দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী সকল মানুষের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হলে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগে শিক্ষায়, বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে নিজেদের সক্ষম করে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণে শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী করতে সরকার কাজ শুরু করেছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের দুই হাজারের বেশি কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এবং সেখানে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথাও তিনি স্মরণ করেন।
বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তারেক রহমান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার কর্মসংস্থানের ধরন বদলে দিচ্ছে। অনেক প্রচলিত পেশা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকলেও নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। তাই শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
তিনি বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সাইবার সিকিউরিটি, ফরেনসিক সায়েন্স, ডিজিটাল উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রোগ্রামিং, নেতৃত্ব বিকাশ, আর্থিক জ্ঞান এবং যোগাযোগ দক্ষতার মতো বিষয়গুলো এখন শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানোটেকনোলজি, থ্রিডি প্রিন্টিং এবং ইন্টারনেট অব থিংসের মতো আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পুরো শিক্ষা কারিকুলামকে বাস্তবভিত্তিক, কর্মমুখী এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছে সরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন ও শ্রমবাজার উপযোগী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে।
শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যম নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনের অন্যতম ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। সে লক্ষ্যে সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে এবং শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর বেকারত্বের ঝুঁকি কমবে।
তবে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দক্ষ পেশাজীবী হওয়ার পাশাপাশি একজন মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের নতুন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণাকে উৎসাহ দিতে প্রতিযোগিতামূলক ভিত্তিতে সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদান করা হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা চাকরিপ্রার্থী হওয়ার পরিবর্তে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসক, শিক্ষক, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।