নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারিক আদালতের রায় মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ঘোষিত হওয়ায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়াকে সরকারের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও এখন নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দণ্ড কার্যকর হতে কত সময় লাগবে?
ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার সেই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে মাত্র ছয় কার্যদিবসে বিচারকাজ সম্পন্ন করে আদালত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। দেশের বিচারিক ইতিহাসে এত দ্রুত সময়ে কোনো চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায় ঘোষণার ঘটনা বিরল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেছেন, রামিসা হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া দেশের ইতিহাসে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকবে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দণ্ড কার্যকরের পথ সুগম হতে পারে।
তবে বিচারিক আদালতের রায়ই কোনো মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুসারে বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় ‘ডেথ রেফারেন্স’ হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। সেখানে পেপারবুক প্রস্তুত, শুনানি এবং পরবর্তী আপিল নিষ্পত্তির দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই দণ্ড কার্যকরের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এই বাস্তবতাই এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ অতীতে বহু আলোচিত মামলার রায় বিচারিক আদালতে ঘোষিত হলেও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপে বছরের পর বছর আটকে থাকার নজির রয়েছে। সিলেটের শিশু রাজন হত্যা মামলা, খুলনার শিশু রাকিব হত্যা মামলা, সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা, মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলা এবং নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সেভেন মার্ডার মামলাসহ অসংখ্য মামলা এখনও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রূহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, রামিসা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও পেপারবুক প্রস্তুতের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হাইকোর্ট বিভাগে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছেন বলেও তিনি জানান।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারিক আদালতের দ্রুত রায় অবশ্যই ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে ন্যায়বিচারের পূর্ণতা নির্ভর করে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ওপর। তাই কেবল রায় ঘোষণা নয়, উচ্চ আদালতের সব ধাপ অতিক্রম করে দণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়েই প্রকৃত অর্থে বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
রামিসা হত্যা মামলায় দ্রুত রায় ঘোষণায় জনমনে স্বস্তি ফিরলেও এখন সবার দৃষ্টি উচ্চ আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে। সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে—মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা কার্যকর কত দ্রুত সম্পন্ন করা যায়, তার ওপরই।