বগুড়ার ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. সুমনুল হক সজীবের বিরুদ্ধে এক নার্সের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কের জেরে তার সংসার ভাঙার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা চলছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একই হাসপাতালে কর্মরত নার্স তাসমিয়া সুলতানা চিকিৎসক সুমনুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যার জেরে ভাঙে নার্সের সংসার। তাসমিয়ার সাবেক স্বামী সাজ্জাদ হোসেন শাহিন জানান, ২০১৪ সালে তিনি এলাঙ্গী পশ্চিমপাড়া গ্রামের হাফিজুর রহমানের মেয়ে তাসমিয়াকে বিয়ে করেন। দুই বছর পর ২০১৬ সালে তাসমিয়া ধুনট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্স হিসেবে যোগ দেন। পরিবার তাদের সম্পর্ক মেনে না নেওয়ায় শাহিন হাসপাতালের কাছেই জমি কিনে বাড়ি করে স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা সংসার শুরু করেন, যেখানে তাদের সাত বছরের একটি ছেলেও রয়েছে। শাহিনের দাবি, কিন্তু সেই সুখে আগুন দেন সুমুনুল। স্ত্রীর সঙ্গে চিকিৎসক সুমনুল হকের সম্পর্কের কারণেই ভাঙে তাদের এই সংসার, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তাসমিয়া তাঁকে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
এই টানাপোড়েনের জেরেই কথা বলতে গেলে গত ২২ আগস্ট সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরে উত্তেজনা তৈরি হয়। সেদিন হাসপাতালে গেলে সাবেক স্ত্রী তাসমিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোন নিয়ে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন শাহিন, খবর পেয়ে স্থানীয়রা তাকে আটক করেন। পরে শাহিন উপস্থিত জনতাকে সাবেক স্ত্রী ও চিকিৎসকের সম্পর্কের কথা জানালে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ক্ষুব্ধ জনতা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার দাবিতে সোচ্চার হন। শেষে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজ্জাদ কাদির ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। ধুনট পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা জানান, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করেছেন এবং কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন নার্স তাসমিয়া সুলতানা। তাঁর দাবি, চিকিৎসক সুমনুল হকের সঙ্গে তাঁর কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না, একজন রোগীর চিকিৎসা নিয়ে কয়েকদিন ফোনে কথা হয়েছিল মাত্র। কিন্তু এ নিয়েই সাবেক স্বামী তাঁকে সন্দেহ করে নির্যাতন করতেন, আর সেই নির্যাতনের কারণেই তিনি তালাক দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চিকিৎসক সুমনুল হকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, বছর ছয়েক আগে তার সংসারও ভেঙেছিল একই ধরনের কারণে। তার স্ত্রী চিকিৎসক মোমেনা পারভীন পারুল স্বামীকে নারী ঘটিত কাজ থেকে ফেরাতে না পেরে তালাক দেন, বর্তমানে তিনি এক ছেলে সন্তান নিয়ে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান টি এম আতিকুর রহমান জানান, সে সময় স্বামী স্ত্রী দুজনেই কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিলেন, সেখানে সুমনুল হক এক নার্স ও এক আয়ার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে একপর্যায়ে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়ে জনরোষের শিকার হন। মোমেনা পারভীন সরাসরি কথা বলতে রাজি না হলেও খুদে বার্তায় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এই ঘটনার জেরে কর্তৃপক্ষ তাকে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করলেও সেখানেও একই অভিযোগ ওঠে। কামারখন্দের সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোমেন উদ্দিন জানান, সেখানে সুমনুল হক এক নার্সের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে তার সংসারও ভাঙেন, আরও দুজন নার্সের সঙ্গেও সম্পর্কের অভিযোগ ছিল। ধরা পড়ার পর গণধোলাইয়ের শিকার হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে ধুনটে বদলি করে, আর সংশ্লিষ্ট নার্সকে বদলি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সব অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন সুমনুল হক নিজে। তার দাবি, এসব ঘটনার কোনো ভিত্তি নেই, তার সম্মানহানি করতে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বিষয়টি সাজিয়েছে। তবে কাজিপুর প্রেসক্লাবের সাংবাদিক আব্দুল মজিদ জানান, একাধিক নার্সের সঙ্গে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বারবার পার পেয়ে গেছেন, কারণ কর্তৃপক্ষ শুধু বদলি করেই দায় সেরেছে, কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজ্জাদ কাদির বলেন, চিকিৎসক সুমনুল হক ও নার্স তাসমিয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জন্য বগুড়ার সিভিল সার্জনকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে। সুমনুল হক একজন চরিত্রহীন চিকিৎসক, তার ব্যক্তিগত সমস্যার কারণেই আগেও একবার সংসার ভেঙেছিল। এমন মানুষের কারণে গোটা চিকিৎসক সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর স্থানীয় বাসিন্দাদের।