পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলনিয়া গ্রামে ১০ বছরের শিশু কামরুন্নাহার কলি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। নিখোঁজের সাত দিন পর বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
গ্রেফতার দুজন হলেন—কুলনিয়া গ্রামের মোঃ মোস্তফা কামাল (৫৫) এবং সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সুবর্ণসারা গ্রামের মোঃ ইয়াছিন আলী (২১)। ইয়াছিন বর্তমানে কুলনিয়া এলাকায় বসবাস করতেন।
পুলিশ জানায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সন্ধ্যায় পাবনা সদর থানার দোগাছী ইউনিয়নের কুলনিয়া গ্রামের কামাল প্রামাণিকের ১০ বছর বয়সী মেয়ে কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর বুধবার সকালে স্থানীয়দের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় কলির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের সঙ্গে লাশ পানিতে ডুবিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত দুটি ইটসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, যেভাবে হত্যাকাণ্ড
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন মোস্তফা ও ইয়াছিন শিশুটিকে ফুসলিয়ে মোস্তফার মুদি দোকানের পেছনের একটি শয়নকক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে মোস্তফার দোকানে থাকা হলুদ রঙের একটি প্লাস্টিকের বস্তায় লাশ ঢুকিয়ে তার ঘরের খাটের নিচে একদিন লুকিয়ে রাখা হয়।
পরদিন রাতে ওই বস্তাবন্দি মরদেহ একটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় ঢুকিয়ে দুটি ইটের সঙ্গে বাঁধা হয়। পরে মোস্তফার টিনশেড বাড়ির পাশে একটি পরিত্যক্ত ডোবার ঝোপঝাড় ও লতাপাতার নিচে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় বলে পুলিশের দাবি।
তবে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে মানববন্ধন এবং এলাকায় বাড়ি বাড়ি তল্লাশির ঘোষণা দেওয়ার পর আসামিরা মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশের তথ্যমতে, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৪টার দিকে পানির নিচ থেকে বস্তাবন্দি মরদেহটি টেনে পাশের একটি সেফটি ট্যাংকের কাছে নিয়ে আসে তারা। কিন্তু লাশের তীব্র দুর্গন্ধ ও কুকুরের ডাক শুনে ভয় পেয়ে সেখানে মরদেহ ফেলে পালিয়ে যায়।
মোবাইল ফোনে মিলল গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত
তদন্তে গ্রেফতারকৃত মোস্তফার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন পর্যালোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে শিশু কলি তার ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মোস্তফার মুদি দোকানে জিনিস কিনতে যায়। ওই সময় মোস্তফা তার মোবাইল ফোনে শিশুটির একাধিক ছবি ধারণ করে পরে সেগুলো মুছে ফেলে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্তকারীরা মুছে দেওয়া ছবিগুলোও পুনরুদ্ধার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, উদ্ধার হওয়া এই ডিজিটাল আলামত মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তদন্তভার ডিবিতে
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মামলাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্তভার পাবনা জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)-এর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত দুই আসামিকে আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। মামলার তদন্ত শেষে বস্তুনিষ্ঠ অভিযোগপত্র দ্রুত আদালতে দাখিলের প্রক্রিয়া চলছে।
গ্রেফতারকৃত আসামিরা
১. মোঃ মোস্তফা কামাল (৫৫)
পিতা—মৃত আঃ মতিন প্রামাণিক, মাতা—মোছাঃ হালিমা বেগম।
সাং—কুলনিয়া, ৮ নম্বর ওয়ার্ড, দোগাছী, পাবনা।
২. মোঃ ইয়াছিন আলী (২১)
পিতা—মৃত মোহাব্বত হোসেন আলী, মাতা—মৃত নুর নাহার বেগম।
স্থায়ী ঠিকানা—সুবর্ণসারা (ঈদগাহ মাঠের সামনে), বেলকুচি, সিরাজগঞ্জ।
বর্তমান ঠিকানা—কুলনিয়া, ৮ নম্বর ওয়ার্ড, দোগাছী, পাবনা।
তদন্তাধীন এই মামলায় গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।