• শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০১:১৮ পূর্বাহ্ন

ঢাকার সড়কে নতুন বাস্তবতা: এআই ক্যামেরার নজরদারিতে বদলাচ্ছে চালকদের আচরণ

প্রতিবেদক / ২২ বার
আপডেট : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

রাত তখন একটা পেরিয়েছে। রাজধানীর রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। তবু মৎস্যভবন সিগন্যাল পয়েন্টে লাল বাতির সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কয়েকটি ব্যক্তিগত গাড়ি। আশপাশে নেই কোনো ট্রাফিক পুলিশ। তারপরও কেউ সিগন্যাল অমান্য করছেন না। কারণ চালকদের জানা—ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিতেও এখন তাদের ওপর নজর রাখছে এক নীরব প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই ক্যামেরা।

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এআই প্রযুক্তি রাজধানীর সড়কে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কোথাও ফাঁকা রাস্তা, কোথাও দীর্ঘ যানজট—সব জায়গাতেই এখন আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার বিকেলে জিপিওর পশ্চিম পাশে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল আরোহীদের মধ্যকার একটি ছোট্ট ঘটনা যেন এই পরিবর্তনের প্রতীক। পেছন থেকে একজন চালক সামনে থাকা আরোহীকে একটু এগিয়ে যেতে বললেও তিনি রাজি হননি।

কারণ, তিনি কোনোভাবেই পথচারী পারাপারের সাদা দাগ অতিক্রম করতে চাননি। তার বিশ্বাস, ওই সিগন্যালেও রয়েছে এআই ক্যামেরা; তাই ডিজিটাল মামলার ঝুঁকি নিতে নারাজ তিনি।

রাজধানীর অনেক চালক বলছেন, কোথায় ক্যামেরা আছে আর কোথায় নেই—তা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না। ফলে তারা এখন আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। অনেকের মতে, আগে ট্রাফিক সার্জেন্টের সঙ্গে কথা বলে বা অনুরোধ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় সেই সুযোগ নেই। তাই আইন ভাঙার আগেই চালকদের মধ্যে কাজ করছে সতর্কতা।

গুলশানের ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, গত কয়েক দিনে তিনি তার চালকের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করার পরও চালক কিছুটা গাড়ি পেছনে নিয়ে নির্ধারিত লাইনের পেছনে দাঁড় করান। তার ভাষায়, “মানুষ এখন শুধু জরিমানার ভয়েই নয়, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাকে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরপেক্ষ মনে করেও নিয়ম মানছে।”

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ গত ৭ মে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সিগন্যালে পরীক্ষামূলকভাবে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করে। এই ব্যবস্থায় আধুনিক ক্যামেরা, দ্রুতগতির সফটওয়্যার এবং বিআরটিএর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এসব ক্যামেরা লাল বাতি অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, স্টপ লাইন অতিক্রম, অবৈধ পার্কিং, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট ছাড়া গাড়ি চালানো এবং গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করছে।

আইন ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যামেরা ন্যূনতম ২৫ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপ ও স্থিরচিত্র প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করে। পরে তা ট্রাফিক বিভাগের কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা প্রস্তুত করা হয়।

এরপর গাড়ির নম্বর প্লেট বিশ্লেষণ করে বিআরটিএর ডেটাবেজ থেকে মালিকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালকের মোবাইল নম্বরে পাঠানো হয় বার্তা। সেই বার্তায় থাকা ওয়েব লিংকে প্রবেশ করলে তিনি দেখতে পারেন—কোথায়, কখন এবং কী ধরনের আইন লঙ্ঘন হয়েছে, তার ভিডিও ও স্থিরচিত্রসহ পূর্ণ বিবরণ। পাশাপাশি ডাকযোগেও পাঠানো হচ্ছে জরিমানার নোটিশ।

ডিএমপি কর্মকর্তাদের দাবি, এই প্রযুক্তি আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বাড়াবে। আগে জনবল সংকট ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে ব্যস্ত সড়কে সব ধরনের আইনভঙ্গ শনাক্ত করা সম্ভব হতো না। এআইভিত্তিক ব্যবস্থাপনা সেই সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনবে।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ইতোমধ্যেই প্রায় তিন হাজারের বেশি ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ভিডিও সার্ভারে জমা হয়েছে বলে জানা গেছে। যাচাই-বাছাই শেষে চারশ থেকে পাঁচশ সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল মামলার নোটিশ সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকদের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসে রাজধানীর ৬০টি স্পটে এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হবে। এক বছরের মধ্যে ঢাকার ১২০টি প্রধান সিগন্যাল পয়েন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৫০০ গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে এ ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ঢাকার মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থা—বিশেষ করে রিকশা, অটোরিকশা, লেগুনার মতো অনিবন্ধিত বা ডেটাবেজবিহীন যানবাহনের উপস্থিতি—এআই প্রযুক্তির পূর্ণ কার্যকারিতার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

যদিও ডিএমপি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শুধু মামলা দেওয়া নয়; বরং রাজধানীর সড়কে আইন মানার নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলা। আর সেই সংস্কৃতির সূচনা হয়তো ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে ঢাকার সিগন্যাল পয়েন্টগুলোতে—যেখানে ফাঁকা রাস্তাতেও এখন লাল বাতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকছেন চালকরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও

ফেসবুকে আমরা