খেলোয়াড়দের পেশী ব্যথা, ক্লান্তি এবং পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্টরা বহু ধরনের কৌশল ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ম্যানুয়াল পারকিউশন থেরাপি একটি পরিচিত নাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে পদ্ধতি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি বাংলাদেশে কেন এখনও ব্যাপকভাবে পরিচিত নয়?
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া চিকিৎসা ও পুনর্বাসন বিষয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পেশীর নমনীয়তা বৃদ্ধি, ব্যথা হ্রাস এবং অনুশীলন-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে ম্যানুয়াল পারকিউশন থেরাপি একটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কাজেই এটিকে একটি বৈজ্ঞানিক পুনর্বাসন কৌশল হিসেবে দেখা হয়।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, শরীরে ছন্দময় টোকা বা আঘাতের মাধ্যমে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার ধারণা নতুন নয়। ম্যাসাজ থেরাপি, অস্টিওপ্যাথি এবং পরবর্তীকালে স্পোর্টস ফিজিওথেরাপির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পারকিউশনভিত্তিক কৌশলগুলোও বিকশিত হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত এই পদ্ধতির কোনো একক আবিষ্কারক নেই। বরং এটি দীর্ঘদিনের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা ও গবেষণার মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি সমন্বিত কৌশল।

বিশ্বের পেশাদার ফুটবল, রাগবি, অ্যাথলেটিক্স এবং ক্রিকেট দলগুলোতে কর্মরত ফিজিওথেরাপিস্টদের কাছে ম্যানুয়াল পারকিউশন থেরাপি অপরিচিত নয়। অনুশীলনের আগে পেশী প্রস্তুত করা, দীর্ঘ ম্যাচের পর ক্লান্তি কমানো এবং পুনর্বাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। জাতীয় পর্যায়ে কিছু ক্লাব ও প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি সেবা থাকলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া পুনর্বাসন ব্যবস্থা এখনও সীমিত। ফলে অনেক খেলোয়াড় আঘাতের পর পর্যাপ্ত চিকিৎসা বা পুনর্বাসন পান না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই ম্যানুয়াল পারকিউশন থেরাপির মতো কম খরচের ম্যানুয়াল কৌশলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ধরনের থেরাপি কি যে কেউ শিখে প্রয়োগ করতে পারবেন? উত্তর হলো—না। কারণ পেশী, স্নায়ু, টেনডন এবং জয়েন্ট সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া ভুল প্রয়োগ রোগীর উপকারের বদলে ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই প্রশিক্ষণ, মানদণ্ড এবং পেশাগত তত্ত্বাবধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের ক্রিকেটার, ফুটবলার, কাবাডি খেলোয়াড় কিংবা গ্রামীণ ক্রীড়াবিদদের ওপর এই পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে ক্লিনিক্যাল গবেষণা পরিচালনা করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ফিজিওথেরাপি ইনস্টিটিউট এবং ক্রীড়া সংগঠনগুলো যৌথভাবে এ ধরনের গবেষণায় এগিয়ে আসতে পারে।
নীতিমালার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে ম্যানুয়াল পারকিউশন থেরাপির জন্য আলাদা কোনো নীতিমালা নেই। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনগুলো চাইলে প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও প্রয়োগবিধি সংক্রান্ত নির্দেশিকা তৈরি করতে পারে।
সরকারি গবেষণা অনুদান, বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্রীড়া ক্লাব এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগও রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই ক্ষেত্রটি দেশে নতুন গবেষণা ও কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ম্যানুয়াল পারকিউশন থেরাপি এখনও বিকাশমান একটি ক্ষেত্র। এর সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে খেলোয়াড়দের সুস্থতা, দ্রুত পুনর্বাসন এবং ক্রীড়া চিকিৎসার উন্নয়নে এটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এমন সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
মো: শোয়েব হোসেন
(সংগীত শিক্ষক, থেরাপি গবেষক ও কলাম লেখক)