আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
বাংলাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া হাম পরিস্থিতি এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত, টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ নিয়ে সতর্কতা বাড়ছে, বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার এ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশে ৩২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে সরকারি হিসাবে ২৫০ জনের বেশি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। নিহতদের বেশির ভাগই শিশু।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতির অবনতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বিশেষ করে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন, ভিটামিন ‘এ’ বিতরণে ঘাটতি, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা শিশুদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা শিবির এলাকায় প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরে তা দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ বিস্তার লাভ করেছে এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে ঢাকা, রাজশাহী বিভাগ ও খুলনা বিভাগ।
এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানিয়েছে, বাংলাদেশে চলমান হাম পরিস্থিতি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত ও মিয়ানমারেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত ছিল। ইউনিসেফ এর মাধ্যমে হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন টিকা সংগ্রহ করা হতো এবং এতে সহায়তা দিত গাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স। নিয়মিত টিকাদান এবং দেশব্যাপী বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকাদানের হার দীর্ঘদিন ৯৫ শতাংশের ওপরে বজায় ছিল।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর জনস্বাস্থ্য প্রশাসনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নেতৃত্বে আসেন মুহাম্মদ ইউনূস। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের দীর্ঘদিনের পদ্ধতি বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্রভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করে। এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ইউনিসেফ সতর্ক করেছিল যে, এতে টিকা সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
পরবর্তীতে প্রশাসনিক জটিলতা ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণে টিকার ঘাটতি তৈরি হয় এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সাল থেকে পিছিয়ে যাওয়া অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হাম টিকা পেয়েছে, যা প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। পরে এ তথ্য সরকারি মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলা হয় বলে দাবি করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
এদিকে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কেও রূপ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রশাসনে প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালনকারী শাফিকুল আলম দাবি করেন, আগের সরকারের আমলে টিকা সংগ্রহে দুর্নীতি হয়েছিল। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো নথিপত্র প্রকাশ করেননি।
অন্যদিকে বীণা সিক্রি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি এখন গুরুতর মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। তার মতে, ইউনিসেফ ও গাভির সহায়তায় পরিচালিত আগের টিকাদান ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুদের ওপর এর প্রভাব মারাত্মক হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্য অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তদন্ত করা যেত, কিন্তু টিকাদান ব্যবস্থা ব্যাহত করা উচিত হয়নি। তার ভাষায়, ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো দ্রুত টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল করা, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কারণ সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।