আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই আলোচনায় তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের তেলের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন। একই সময়ে হরমুজ প্রণালী সচল রাখতে মধ্যস্থতায় আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। তবে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি কঠোর শর্তকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখনো তীব্র রয়ে গেছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, চলমান আলোচনার পুরো সময়জুড়ে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল রাখতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগের প্রস্তাবগুলোর তুলনায় এবার ওয়াশিংটনের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা দেখা গেলেও তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার ছাড়া কোনো সমঝোতায় যেতে চায় না।
ওয়াশিংটনের প্রস্তাব অনুযায়ী, আপাতত শুধুমাত্র মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের আওতাধীন কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হতে পারে, যা চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে দুই পক্ষের গভীর মতপার্থক্য এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে চীনের সক্রিয় কূটনীতি
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর চীন সরাসরি মধ্যস্থতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, শি জিনপিং ইরান সংকট নিরসন এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হরমুজ প্রণালী সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে বেইজিং।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা প্রমাণ করছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক এখন কেবল বাণিজ্য বা প্রযুক্তির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নেও দুই শক্তিধর দেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের পাঁচ কঠোর শর্ত
মার্কিন-ইরান শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তেহরানের সামনে পাঁচটি কঠোর শর্ত তুলে ধরেছে ওয়াশিংটন। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ জানিয়েছে, এসব শর্তের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— ইরানের হাতে থাকা প্রায় ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করে দেশের ভেতরে কেবল একটি স্থাপনা সচল রাখার কথাও বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে, তার কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের সম্পদের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির বিষয়টিও আলোচনার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে আপসহীন তেহরান
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের আপস করবে না তারা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, এটি আলোচনার বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় ইরানের এই অধিকার স্বীকৃত।
তিনি বলেন, নন-প্রোলিফারেশন চুক্তি অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার ইরানের রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা আগের মতো নেই।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, পাল্টা জবাবের প্রস্তুতিতে ইরান
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দ্রুত কোনো চুক্তি না হলে ইরানকে ‘কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ’ সামরিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
তার বক্তব্যের পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুলফজল শেকারচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন কোনো সামরিক আগ্রাসনের চেষ্টা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী জবাবের মুখোমুখি হবে।
হরমুজ নিয়ন্ত্রণে নতুন সংস্থা
হরমুজ প্রণালির সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা তদারকিতে নতুন বিশেষায়িত সংস্থা গঠন করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালী কর্তৃপক্ষ’ নামে এই সংস্থা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, নৌ চলাচল এবং সামগ্রিক পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করবে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই পথ দিয়ে চলাচল করায় হরমুজ প্রণালিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে পাকিস্তানও। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি তেহরানে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। কাতার ইসলামাবাদের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইশাক দারও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কূটনীতির নতুন সমীকরণ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।