নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশে গত দুই দশকে টেলিযোগাযোগ খাতের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে দেশের ১৮ কোটির বেশি মোবাইল সিম ব্যবহার হচ্ছে। এই বিশাল নেটওয়ার্ক সচল রাখতে সারাদেশে স্থাপন করা হয়েছে হাজার হাজার মোবাইল টাওয়ার বা বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন। তবে এসব টাওয়ার থেকে নির্গত তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ নিয়ে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিকিরণের দুইটি প্রধান প্রভাব আলোচনায় আসে—একটি পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত, অন্যটি জীববৈচিত্র্যের ওপর। কিছু গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দাবি করা হয়েছে, মোবাইল টাওয়ারের নিকটবর্তী এলাকায় চড়ুই পাখি, মৌমাছিসহ ছোট পাখি ও পতঙ্গের আচরণে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এতে তাদের দিকনির্ণয় ক্ষমতা ব্যাহত হওয়া এবং প্রজনন ও চলাচলে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়।
এছাড়া কিছু মতামতে বলা হয়েছে, টাওয়ারের কাছাকাছি গাছপালার বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, পাতার বিবর্ণতা, ফুল ও ফল ঝরে পড়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। যদিও এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন গবেষণা ও মত রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের ছাদে টাওয়ার স্থাপন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থাপনার কারণে দীর্ঘমেয়াদে মাথাব্যথা, অনিদ্রা, ক্লান্তি, মানসিক অবসাদসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগের কথা বলা হচ্ছে।
অপরিকল্পিত টাওয়ার স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অপারেটরের টাওয়ার একই ভবনের ছাদে স্থাপনের উদাহরণ পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে নিয়মনীতি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে বিচারিক পর্যায়েও আলোচনা চলছে। জনস্বার্থে দায়ের করা একাধিক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময় নির্দেশনা দিয়েছেন। ২০১৯ সালের এক আদেশে টাওয়ারের বিকিরণ পর্যবেক্ষণ, জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে ক্ষতিকর স্থাপনা সরানো এবং নির্ধারিত মান বজায় রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও জনসমাগমস্থলের কাছাকাছি টাওয়ার স্থাপন নিরুৎসাহিত করার কথাও বলা হয়।
সম্প্রতি আদালত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আরও গবেষণার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা যায়। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে টাওয়ার থেকে নির্গত বিকিরণের প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান মানদণ্ড আন্তর্জাতিক নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনার কথাও আলোচনায় এসেছে।
এদিকে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, একক টাওয়ার ব্যবহার, টাওয়ার শেয়ারিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং ফাইবার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে পরিবেশগত চাপ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
সব মিলিয়ে মোবাইল টাওয়ার আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হলেও এর স্থাপনা ও ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দিকেই গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।