শাহরিয়ার কবির, খুলনা
ডিজিটাল যুগে যখন মোবাইল ফোনের এক স্পর্শে পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের সব খবর, তখনও প্রতিদিন ভোরের অপেক্ষায় থাকেন কিছু মানুষ। আর সেই অপেক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক মানুষের চার দশকের বেশি সময়ের সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা। তিনি পাইকগাছা উপজেলার প্রবীণ পত্রিকা পরিবেশক সুরমান গাজী। যিনি প্রায় ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে উপজেলার মানুষের হাতে সংবাদপত্র পৌঁছে দিয়ে চলেছেন নিরলসভাবে।
এক সময় রাত জেগে লঞ্চঘাটে দাঁড়িয়ে পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে হতো তাঁকে। খুলনা থেকে গুলিস্তান লঞ্চযোগে পত্রিকা আসত পাইকগাছায়। গভীর রাত পেরিয়ে ভোর ৩টার দিকে লঞ্চ থেকে পত্রিকা নামিয়ে শুরু হতো তাঁর কর্মব্যস্ততা। তারপর সেই পত্রিকা পৌঁছে দিতেন পাঠকের হাতে হাতে।
স্মৃতিচারণ করে সুরমান গাজী বলেন, “আমি ১৯৮০ সাল থেকে সুন্দরবন প্রেসের পাশে বসে পত্রিকা বিক্রি শুরু করি। পরে পুরাতন সোনালী ব্যাংকের পাশে, এরপর কপোতাক্ষ মার্কেটের সামনে এবং বর্তমানে পোস্ট অফিস সংলগ্ন পাইকগাছা নিউজ কর্নারে বসে পত্রিকা বিক্রি করছি। তখন পায়ে হেঁটে পত্রিকা বিলি করতাম। অনেক কষ্ট ছিল, কিন্তু কাজের প্রতি ভালোবাসা ছিল আরও বেশি। আমি এই উপজেলার প্রথম পত্রিকা পরিবেশকদের একজন।”
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পোস্ট অফিস সংলগ্ন পাইকগাছা নিউজ কর্নারে বসে আছেন সুরমান গাজী। বয়সের ভার শরীরে পড়লেও দায়িত্ব পালনে এখনো ক্লান্তির ছাপ নেই। কেউ পত্রিকা কিনছেন, কেউ আবার দাঁড়িয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। ছোট্ট সেই স্টলটি যেন আজও সংবাদপিপাসু মানুষের এক পরিচিত ঠিকানা।
প্রতিদিনের পাঠক এমনই একজন বলেন, “আমি নিয়মিত সুরমান কাকার কাছ থেকে পত্রিকা কিনি। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে এখানে বসে থাকতে দেখছি। পত্রিকার সঙ্গে তাঁর নামটাও যেন জড়িয়ে গেছে।”
সুরমান গাজীর উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৯৪ সাল থেকে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হন তাঁর ছেলে আশিকুর রহমান (আ. সালাম)। বর্তমানে তিনিই পরিচালনা করছেন পাইকগাছা নিউজ কর্নার।
তিনি বলেন, “আগের মতো এখন আর মানুষ পত্রিকা পড়ে না। অনলাইনের কারণে ছাপা পত্রিকার পাঠক কমে গেছে। ফলে হকারদের আয়ও কমেছে। অনেকেই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধাও নেই। তারপরও আমরা চেষ্টা করি পত্রিকার এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে।”
পাইকগাছা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন সোহাগ বলেন, “সুরমান ভাই পাইকগাছার প্রথমদিকের পত্রিকা পরিবেশকদের একজন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজ করে যাচ্ছেন। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়—কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। পাঠকের হাতে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই তিনি নিজের দায়িত্ববোধ খুঁজে পান।”
সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সংবাদপত্রের জগৎ, বদলে গেছে পাঠকের অভ্যাসও। কিন্তু সুরমান গাজীর মতো কিছু মানুষ এখনো ধরে রেখেছেন সংবাদপত্রের সেই সোনালি ঐতিহ্য। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শুধু পত্রিকা বিক্রি করেননি, সংবাদ ও পাঠকের মধ্যে গড়ে তুলেছেন এক মানবিক সেতুবন্ধন। পাইকগাছার ইতিহাসে তাই একজন সাধারণ পত্রিকা বিক্রেতা নন, সুরমান গাজী হয়ে উঠেছেন সংবাদপ্রেম, অধ্যবসায় ও দায়িত্ববোধের এক জীবন্ত প্রতীক।