• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:১৮ পূর্বাহ্ন

সৈয়দপুরে মাদরাসার দপ্তরি কাম জজকোর্টের মুহুরি,প্রতিষ্ঠান প্রধানের সহায়তায় দায়িত্বে ফাঁকি

মো:জাকির হোসেন নীলফামারী প্রতিনিধি / ৯ বার
আপডেট : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

সকালে মাদরাসার হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই তিনি ছুটেন জজকোর্টে। সেখানে মুহুরির কাজ করে দুপুর পেরিয়ে আবার হাজির হন মাদরাসায়। এভাবেই একসাথে দুই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন একজন মাদরাসার দপ্তরি। এমন অনিয়মের ঘটনা নিয়মিতই ঘটে চলেছে মাদরাসা প্রধানের মদদে। বছরের পর বছর ধরে এমন হলেও নির্বিকার কর্তৃপক্ষ।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের উত্তর সোনাখুলী সরকারপাড়া দাখিল মাদরাসার ঘটনা এটা। এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুর ২ টায় সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, ওই প্রতিষ্ঠানে দপ্তরি পদে চাকরি করেন এলাকার রবিউল ইসলাম। যিনি মূলত: মুহুরি হিসেবেই পূর্ব থেকে পরিচিত। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে দলীয় ও এলাকার লোক হিসেবে এবং মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বাগিয়ে নেন এই চাকরি।

নিয়োগের পর থেকেই দাপটের সাথে দপ্তরির দায়িত্বের পাশাপাশি আগের মুহুরি পেশাও চালিয়ে যাচ্ছেন সমানতালে। বাড়ির পাশেই প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এই সুবিধা ভোগ করছেন বেশ সহজেই। সেই সাথে মাদরাসার প্রধানও সুযোগ দিয়ে যাচ্ছেন যথেষ্ট। ফলে সকালে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েই চলে যান জেলা শহর নীলফামারী জজকোর্টে।

সেখানে মুহুরি পেশার কাজ করে মাদরাসা ছুটির আগেই ফিরে এসে যোগ দেন দপ্তরির কাজে। কোন কোন দিন তা সম্ভব না হলে বাড়ি থেকে অন্য কেউ এসে সারেন বাকি কাজ। মাঝে প্রতি পিরিয়ডের ঘন্টা বাজানোর কাজ কোন শিক্ষককে দিয়ে করিয়ে নেন মাদরাসা প্রধান। এভাবে একের ভেতর দুই হয়ে ভিন্ন দুটি পেশায় কাজ করে অর্থ আয়ের সাথে কর্মপটুতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি।

এলাকার সাবেক ইউপি মেম্বার খলিলুর রহমানের ছেলে আব্দুল্লাহ বলেন, প্রথম থেকেই এমন অনিয়মের মধ্য দিয়ে চাকরি করছে পিয়ন রবিউল। বিগত পুরো আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাপকভাবে চলেছে। কোন কাজই করতোনা সে। আর এখন তালা খুলে পতাকা তুলে দিয়েই দায়িত্ব শেষ। নিয়োগের সময় যে মোটা অংকের টাকা দিয়েছে তার ভাগ নেওয়ার কারণে এখনো সেই সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন সুপারিন্টেন্ডেন্ট।

আমরা এলাকাবাসী এ বিষয়ে বার বার বললেও ভ্রুক্ষেপ করেননি তিনি। উল্টো হাতে নাতে ধরিয়ে দিলে ছুটি নিয়েছে বলে কৌশলে বাঁচিয়ে দেন। আজকেও (মঙ্গলবার) ধরা হলে একই কথা বলেন। অথচ হাজিরা খাতায় বেলা ২ টা পর্যন্ত ফাঁকা রাখা হয়েছে যেন পরে স্বাক্ষর করতে পারে। আমরা দেখিয়ে দিলে লাল কলম দিয়ে অনুপস্থিত করেন। যে কারণে সাংবাদিকদের খবর দিয়েছি।

এলাকার আরও অনেকে অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, রবিউল মূলত: মুহুরি। কাজ না করেই বাড়তি আয়ের জন্য টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছে। সে প্রতিদিনই কোর্টে যায়। মাদরাসায় থাকেনা। কিন্তু বেতন ঠিকই নিচ্ছে। এতে সুপারিন্টেন্ডেন্টসহ কমিটির লোকজন ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতা আছে। তারা গোপন সুবিধা নিয়েই এমন সুযোগ দিয়ে যাচ্ছেন। এটা তদন্ত হওয়া এবং ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বেশ আক্ষেপ করে বলেন, একজন পিয়নকে এভাবে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিও পূরণ করা হয়না। উল্টো ওই পিয়নের কাজ করানো হয় শিক্ষককে দিয়ে। যা চরম অবমাননাকর। এর একটা বিহিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু চাকরির জন্য আমরা মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছি।

আবার অন্য আরেক শিক্ষক বলেন, মূলত: মানবিক কারণেই এই সুবিধা দিচ্ছেন সুপারিন্টেন্ডেন্ট। কারণ রবিউল বেশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তাই বাড়তি আয়ের মাধ্যমে যেন সে ঋণমুক্ত হতে পারে সেজন্য তাকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে তা মাঝে মধ্যে। সবসময় বা প্রতিদিন নয়। আর যেদিন সে কোর্টে যায় সেদিন তাকে ছুটি দিয়ে অনুপস্থিত দেখানো হয়।

প্রতিষ্ঠানের প্রধান (সুপারিন্টেন্ডেন্ট) মোশাররফ হোসেন বলেন, দপ্তরি পদের রবিউল ইসলাম আজ অনুপস্থিত। তবে সে পারিবারিক কারণে নীলফামারীতে আদালতে যাওয়ার জন্য মোবাইল করে ছুটি নিয়েছে। সে এভাবে নিয়মিত কোর্টে গিয়ে মুহুরির কাজ করেন জানতে চাইলে তিনি নিশ্চুপ থাকেন। এসময় আব্দুল্লাহসহ আরও দুইজন এলাকাবাসী আগেও অভিযোগ দেওয়ার কথা বলেন। এতেও তিনি তাদের জবাব দিতে পারেননি।

অভিযুক্ত রবিউল ইসলামকে মুঠোফোন কল করা হলে তিনি বলেন, আমি পারিবারিক জমির সমস্যার কারণে কোর্টে আছি। আগে থেকে ছুটি না নিয়ে কেন মাদরাসায় অনুপস্থিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুপারিন্টেন্ডেন্ট কে মোবাইল করে ছুটি নিয়েছি। তিনি কিছু বলেননি। সেখানে অন্য কেউ যাই বলুক তাতে আমার কিছু আসে যায় না।

সৈয়দপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামকে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বেলা ৩ টায় মুঠোফোনে অভিযোগের বিষয়ে জানালে তিনি বলেন, আমার কাছে কেউ এমন কোন অভিযোগ করেননি। তাই এব্যাপারে কোনো কিছু বলতে পারবোনা। লিখিত অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে। আমি এখন বাড়ি যাচ্ছি এর চেয়ে আর কিছু বলতে পারবোনা বলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও

ফেসবুকে আমরা