• শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
‘আদরে আদরে’ দিয়ে সজিব-রিমির নতুন জুটি আবারও আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে ইরান জানা গেল ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনালের ভেন্যুর নাম সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ফের মুখ খুললেন মেঘনা আলম গোপালগঞ্জে ডিবি পুলিশের অভিযানে ইয়াবাসহ নারী কারবারি আটক বগুড়ায় বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গ্ৰেফতার ১ , উদ্ধারকৃত লাশটি নৃত্য শিল্পী নিঝুমের চুয়াডাঙ্গায় ৪৫ সার ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩ আবেদন এক সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে: প্রধানমন্ত্রী নড়াইলের লোহাগড়া আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কুপিয়ে হত্যা দিনাজপুর বীরগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৫ নেশাখোরের ৬ মাস করে কারাদণ্ড

৯/১১-এর ২৫ বছর: কাটেনি গোয়েন্দা ব্যর্থতার ঝুঁকি

প্রতিবেদক / ১১ বার
আপডেট : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অথচ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলায় সেই দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। হামলার আগে প্রয়োজনীয় অনেক গোয়েন্দা তথ্য মার্কিন সংস্থাগুলোর হাতে থাকলেও সেগুলো সময়মতো বিশ্লেষণ, সমন্বয় ও কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

‘৯/১১’ নামে পরিচিত সেই হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থাকেই বদলে দেয়নি, বরং পরবর্তী দুই দশকে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি, গোয়েন্দা কাঠামো ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা কৌশলের গতিপথও পাল্টে দিয়েছে। বিবিসির নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিবেদক ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনারের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই পরিবর্তনের নানা দিক।

হামলার আগেই ছিল সতর্কবার্তা

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার আত্মঘাতী বিমান হামলায় ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। কিন্তু হামলাটি হঠাৎ করে ঘটেনি। এর বহু আগেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ আল-কায়েদা নেটওয়ার্ক এবং এর নেতা ওসামা বিন লাদেনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ছিল। এমনকি বিন লাদেনকে খুঁজে বের করতে বিশেষ টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছিল।

তারপরও বিভিন্ন সংস্থার হাতে থাকা তথ্য একত্র করে সম্ভাব্য হামলার পূর্ণ চিত্র আঁকা সম্ভব হয়নি।

হামলার নয় দিন পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ এক সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযান, যার প্রভাব আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দৃশ্যমান।

৯/১১ থেকে যে শিক্ষা নিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো

৯/১১ কমিশনের প্রতিবেদনে মার্কিন সরকারের ‘কল্পনাশক্তি, নীতি, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা’র কথা উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে সিআইএ ও এফবিআইয়ের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্যের যথাযথ আদান-প্রদান ও মূল্যায়নের ঘাটতিকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ‘ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার’ গঠন করা হয়। পাশাপাশি সৃষ্টি করা হয় ‘ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’ পদ।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সহযোগিতাও আরও গভীর হয়েছে। সিআইএ ও ব্রিটিশ এমআই৬-এর পাশাপাশি ‘ফাইভ আইজ’ জোটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে।

ইরাক যুদ্ধ: আরেক বড় গোয়েন্দা ব্যর্থতা

৯/১১-এর পর সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুলগুলোর একটি ছিল ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযান। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (WMD) রয়েছে—এমন দাবির পক্ষে যে গোয়েন্দা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল, পরে তার বড় অংশই ভুল বা যাচাইহীন প্রমাণিত হয়।

ইরাক যুদ্ধ নিয়ে পরবর্তী ‘বাটলার রিভিউ’-তে বলা হয়, দেশটির কথিত WMD কর্মসূচি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা তথ্য ছিল ‘মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ এবং তা অসত্য বা যাচাইহীন উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল ছিল।

ইরাক যুদ্ধের পর এমআই৬ তাদের কাঁচা গোয়েন্দা তথ্য যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে।

সন্ত্রাস দমনে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও

যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এমআই৫ ৯/১১-এর পর সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক সন্দেহভাজন ও একসঙ্গে অসংখ্য তদন্ত পরিচালনার কারণে কোন হুমকিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—সেটিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

২০০৫ সালের লন্ডন হামলায় ৫২ জন নিহত হন। হামলার মূল পরিকল্পনাকারী মোহাম্মদ সিদিক খান সম্পর্কে এমআই৫ আগে থেকেই কিছু তথ্য জানত। কিন্তু তিনি কী ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছেন, তা সংস্থাটি বুঝতে পারেনি।

২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনা হামলাও ব্রিটিশ গোয়েন্দা ব্যবস্থার আরেকটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

৯/১১-এর পর মানবাধিকার নিয়ে বিতর্ক

সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান শুরু করে। এর অংশ হিসেবে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক করে গুয়ান্তানামো বে-তে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিচার ছাড়াই দীর্ঘদিন আটক রাখা এবং বন্দিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরবর্তীতে মার্কিন হেফাজতে থাকা বন্দিদের নির্যাতনের নানা ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।

যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। লিবীয় ইসলামপন্থী আবদুল হাকিম বেলহাজ ও তার স্ত্রীকে লিবিয়ায় হস্তান্তরের ঘটনায় এমআই৬-এর সম্পৃক্ততার অভিযোগ পরে প্রকাশ্যে আসে। ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল এ ঘটনায় পার্লামেন্টে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

সন্ত্রাসবাদ থেকে নজর রাশিয়া ও চীনে

৯/১১-এর পর প্রায় দুই দশক ধরে পশ্চিমা গোয়েন্দা ও সামরিক সংস্থাগুলোর বড় অংশের মনোযোগ ছিল আল-কায়েদা, তালেবান, আইসিস ও ইরাক-আফগানিস্তানের দিকে।

এ সময় রাশিয়া ও চীন নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এমআই৬-এর সাবেক প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ঙ্গারের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো চীনের উত্থানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে পারেনি।

রাশিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের মূল্যায়ন সামনে এসেছে। ২০১৬ সালে ব্রিটিশ জেনারেল স্যার রিচার্ড শিরেফ ‘ওয়ার উইথ রাশিয়া’ নামে একটি উপন্যাস লেখেন, যেখানে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছিল।

চীন এখন শুধু সামরিক শক্তি নয়

বর্তমানে চীন পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তবে চীনকে বোঝার চ্যালেঞ্জ কেবল সামরিক শক্তি বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি, বন্দর, টেলিযোগাযোগ ও শিল্প সক্ষমতার মতো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত খাতও এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যা অনেক সময় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে নয়; বরং বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো একত্র করে বৃহত্তর কৌশলগত চিত্র বুঝতে ব্যর্থতায়।

প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে গোয়েন্দা যুদ্ধও

৯/১১-এর সময় বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি আজকের মতো উন্নত ছিল না। বর্তমানে মুখমণ্ডল, চোখের আইরিস ও চলাফেরার ধরন শনাক্ত করার প্রযুক্তির কারণে গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও জটিল হয়েছে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বিকাশ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।

২৫ বছর পরও বড় প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে

৯/১১-এর ২৫ বছর পর পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য আদান-প্রদান, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় অনেক এগিয়েছে। কিন্তু বড় কৌশলগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য সঠিকভাবে বিশ্লেষণ ও কাজে লাগানোর প্রশ্নটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা দেখিয়েছে, বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতার ঝুঁকি এখনও শেষ হয়নি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু কত তথ্য সংগ্রহ করা গেল—তা নয়। বরং সেই তথ্যের বিচ্ছিন্ন অংশগুলো একত্র করে সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেল কি না, সেটিই জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও

ফেসবুকে আমরা