একটি পৌর ভবন নির্মাণে কত সময় লাগতে পারে? দুই বছর, তিন বছর? কিন্তু খুলনার পাইকগাছা পৌরসভার ‘টাইপ-বি’ পৌর ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সময় যেন এক অন্তহীন গোলকধাঁধা। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি যেখানে থমকে আছে, সেখানে প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব নিয়ে। দৃশ্যত এটি এখন কেবল একটি অর্ধসমাপ্ত ভবন নয়, বরং স্থানীয়দের কাছে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার এক জ্বলন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে।
নথিতে উন্নয়ন, বাস্তবে জঞ্জাল:
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মেসার্স জিয়াউল ট্রেডার্স নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে। নিয়ম অনুযায়ী ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নান্দনিক এই ভবনের চাবি পৌরসভার হাতে থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা চরম হতাশাজনক। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও কাজের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৬৫ শতাংশে আটকে আছে। মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটি এখন জরাজীর্ণ কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে, যা আধুনিক নগর সেবার বদলে স্থানীয়দের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাজ ও বিলের অসঙ্গতি:
সচেতন মহলের প্রশ্ন প্রকল্পের অন্যতম আলোচিত দিক হলো অর্থ ছাড়ের বিষয়টি। যেখানে ভৌত অগ্রগতি অর্ধেকের সামান্য বেশি, সেখানে ইতিমধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বিল হিসেবে তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সচেতন মহলের প্রশ্ন—কাজের এই কচ্ছপ গতির মাঝেও মোট বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক টাকা কীভাবে ছাড় করা হলো? এটি কি কেবল আমলাতান্ত্রিক নিয়ম, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো গাফিলতি?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সময় বাড়ানো হলেও মাঠ পর্যায়ে কাজের কোনো দৃশ্যমান গতি নেই। মাঝে মাঝে লোকদেখানো কাজ শুরু হলেও কিছুদিন পর আবার সব জনমানবহীন হয়ে পড়ে। এই ধীরগতির কারণে পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং নাগরিকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তদারকি নিয়ে ক্ষোভ
নিয়মিত মনিটরিং থাকলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ কীভাবে বছরের পর বছর স্থবির থাকতে পারে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স জিয়াউল ট্রেডার্স’-এর উদাসীনতা এবং তদারকি প্রতিষ্ঠানের শিথিলতাই এই অচলাবস্থার মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পৌর এলাকার বাসিন্দারা এই দীর্ঘসূত্রতাকে ‘উন্নয়নের নামে প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করে দ্রুত এই প্রকল্পের ধীরগতির কারণ অনুসন্ধানে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
ফান্ডের সংকট ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন:
কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ভবন নির্মাণে এমন স্থবিরতার কারণ খুঁজতে গিয়ে কথা হয় পৌরসভার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী নুর আহমদের সাথে। তিনি কাজের ধীরগতির বিষয়টি স্বীকার করে স্পষ্ট জানান, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ পৌরসভার নিজস্ব তহবিলের টাকায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে ফান্ডে কোনো অর্থ না থাকায় নির্মাণ কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে।
এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন:
যদি নিজস্ব তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থই না থাকবে, তবে ৬ কোটিরও বেশি টাকার প্রাক্কলন (Estimate) করে কার্যাদেশ দেওয়া হলো কীভাবে? প্রকল্প শুরুর আগে ফান্ডের নিশ্চয়তা না থাকা কি চরম প্রশাসনিক দূরদর্শিতার অভাবকে নির্দেশ করে না?
এদিকে, ফান্ডের সংকটের পাশাপাশি প্রকল্পের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও ঠিকাদারের সটকে পড়ার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন উপজেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “সরকারি বাজেটের আওতায় ঠিকাদার যে পরিমাণ কাজ সম্পন্ন করেছিলেন, সে অনুযায়ী তিনি চলতি বিল (রানিং বিল) পেয়েছিলেন। তবে সরকার পরিবর্তনের পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এলাকা ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।”
উন্নয়নের এই বিশাল ফ্রেমওয়ার্ক যখন রাজনৈতিক হাওয়া বদল আর প্রশাসনিক ফান্ডের মারপ্যাঁচে আটকে থাকে, তখন কোটি কোটি টাকার এই অপচয় ও জনভোগান্তির দায় কে নেবে? এই অচলাবস্থা নিরসনে এবং জনস্বার্থ রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।