নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
জমির খতিয়ান সংগ্রহ, নামজারি সম্পন্ন করা কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ-একসময় এসব কাজ সাধারণ মানুষের কাছে ছিল দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি ও অতিরিক্ত ব্যয়ের আরেক নাম। কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হতো নাগরিকদের। তথ্যের অস্বচ্ছতা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষকে পড়তে হতো সীমাহীন দুর্ভোগে।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর অটোমেশন ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে দেশের ভূমি সেবায় এখন দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর ফলে নাগরিকরা ঘরে বসেই মোবাইল ফোন বা অনলাইনের মাধ্যমে খাজনা পরিশোধ, নামজারি আবেদন, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। এতে যেমন সময় ও খরচ কমছে, তেমনি দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এমদাদুল হক চৌধুরী বাসসকে বলেন, অটোমেশনের কারণে এখন জনগণকে অধিকাংশ ভূমি সেবার জন্য সরাসরি অফিসে যেতে হয় না। অনলাইনভিত্তিক সেবার ফলে স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং সেবা গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। তবে মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে, যাতে দালালচক্রের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমে আসে।
সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে। বর্তমানে অনলাইনে ই-নামজারি আবেদন, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ, অভিযোগ দাখিল এবং ভূমি সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের সুবিধা চালু রয়েছে।
ঘরে বসেই খাজনা পরিশোধ
একসময় ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো নাগরিকদের। অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার ভূমি অফিসে যাতায়াতের প্রয়োজন পড়ত। এখন মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই খাজনা পরিশোধ করা যাচ্ছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ই-পর্চা ও ই-খাজনা কার্যক্রম চালুর পর প্রতিবছরই অনলাইনে কর পরিশোধকারীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ নাগরিক অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিও রয়েছেন, যারা বিদেশে বসেই নিজেদের জমির খাজনা পরিশোধ করতে পারছেন।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, আগে খাজনা দিতে পুরো একটি দিন নষ্ট হয়ে যেত। এখন মোবাইল ফোনেই কয়েক মিনিটে কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে রসিদও পাওয়া যাচ্ছে।
অনলাইনে নামজারিতে কমছে দালাল নির্ভরতা
জমি কেনাবেচার পর মালিকানা হালনাগাদ বা নামজারি প্রক্রিয়া আগে ছিল সবচেয়ে জটিল ও সময়সাপেক্ষ ধাপগুলোর একটি। অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালের সহায়তা নিতেন এবং সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতেন।
বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক নামজারি ব্যবস্থার কারণে আবেদনকারী নিজেই আবেদন করতে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করতে এবং মোবাইল ফোনে আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। প্রতিটি ধাপে এসএমএস নোটিফিকেশন চালু থাকায় তাৎক্ষণিক তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটির বেশি ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বর্তমানে আরও প্রায় পাঁচ লাখ আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) নাসরিন জাহান বলেন, অনলাইন নামজারি সেবা ভূমি সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমিয়েছে। আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মাঠ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নামজারি সম্পন্ন না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
হাতের নাগালে খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ
ভূমি সংক্রান্ত প্রতারণা ঠেকাতে খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকেই ভুয়া কাগজপত্রের ফাঁদে পড়তেন। এখন অনলাইনে জমির মালিকানা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির পরিমাণ সহজেই যাচাই করা যাচ্ছে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শিমুল চক্রবর্তী বলেন, আগে জমির কাগজ যাচাই করতে অনেক ঝামেলা হতো। এখন অনলাইনে তথ্য মিলিয়ে সহজেই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে কোন তথ্য সঠিক।
বাড়ছে জবাবদিহিতা, কমছে দুর্নীতি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইনভিত্তিক ভূমি সেবা চালুর ফলে সেবার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বেড়েছে। নির্ধারিত ফি ও সময়সীমা অনলাইনে উন্মুক্ত থাকায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি কিংবা অযৌক্তিক বিলম্বের সুযোগ কমেছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন কর্মকর্তা কতদিন ধরে একটি আবেদন আটকে রেখেছেন, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার শিক্ষক শাহাদাত হোসেন বলেন, আগে মনে হতো নামজারি করা খুব কঠিন। কিন্তু এবার অনলাইনে আবেদন করে সহজেই কাজ সম্পন্ন করেছি। কোনো দালালের প্রয়োজন হয়নি।
ডিজিটাল ডাটাবেজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের সব ভূমি রেকর্ড, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার পুরোনো রেকর্ড স্ক্যান করে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ এবং মামলা-মোকদ্দমা কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র শনাক্ত, একই জমি একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা প্রতিরোধ এবং আবেদন দ্রুত যাচাইয়ের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অটোমেশনের মাধ্যমে ভূমি সেবার প্রতিটি তথ্য এখন ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে জিআইএস প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা চালু হলে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলা আরও কমে আসবে।