নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে অভিভাবকরা ছুটে এলেও চিকিৎসার পাশাপাশি এখন তাদের বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যয়ভার। অনেক দরিদ্র পরিবার চিকিৎসা চালাতে গিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে, কেউ কেউ শেষ সম্বলও বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে এক বছর বয়সী সন্তান রাফিদকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন দিনমজুর আশরাফুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরে শিশুর অবস্থার অবনতি ঘটে। স্থানীয় চিকিৎসা ব্যর্থ হলে তাকে ঢাকায় আনা হয়।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, “কয়েকদিন কাজ বন্ধ থাকায় সংসারে টান পড়েছে। আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এত টাকা কোথা থেকে দেব, বুঝতে পারছি না।”
একই ওয়ার্ডে ভর্তি সাত বছরের শিশু জামিলিকে নিয়ে কুমিল্লা থেকে এসেছেন মা নাজমা বেগম। তিনি জানান, শুরুতে জ্বর ও চোখ লাল হওয়া থেকে ধীরে ধীরে শরীরে র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় আনা হয়।
নাজমা বেগম বলেন, “ঢাকায় আসার সময় মেয়েটা বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল। হাসপাতালে এসে সিট পেতেও অনেক দেরি হয়েছে। চিকিৎসার খরচ চালাতে ধার করতে হচ্ছে। সুস্থ হওয়ার পর এই ঋণ কীভাবে শোধ করব, সেটাই চিন্তা।”
চিকিৎসকদের মতে, গত দুই মাসে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে অপুষ্টি ও টিকাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসায় নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে, ফলে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালে অনেক অভিভাবক বারান্দা ও মেঝেতে রাত কাটাচ্ছেন। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক ও দিনমজুররাই বেশি।
রাজশাহী থেকে আসা কাদের আলী জানান, দুই সন্তানই হামে আক্রান্ত। প্রথম সন্তানের চিকিৎসায় প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। “একটা গরু বিক্রি করেছি, তবু খরচ শেষ হচ্ছে না,” বলেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে হামের ঝুঁকি বেশি। টিকাদানে অনীহা, অপুষ্টি ও ঘনবসতি পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, “অপুষ্ট শিশুরা দ্রুত জটিলতায় পড়ে। অনেক পরিবার দেরিতে হাসপাতালে আসে, ফলে ব্যয় বাড়ে। শুধু হাসপাতাল নয়, স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদান ও দরিদ্র পরিবারের জন্য জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা তহবিল প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, অর্থের অভাবে কোনো শিশুর চিকিৎসা বন্ধ হওয়া উচিত নয়। সময়মতো কমিউনিটি পর্যায়ে সহায়তা না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।