ইয়াসিন আরাফাত, নিজেস্ব প্রতিনিধি
টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঝিনাইদহে বোরো ধানের খড় ও বিচালি সংগ্রহে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। মাঠে কাটা ধান শুকাতে না পারায় খড় ভিজে নষ্ট হচ্ছে, কালো হয়ে যাচ্ছে বিচালি। এতে জেলায় গোখাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন গরু পালনকারী খামারি ও প্রান্তিক কৃষকরা।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠজুড়ে পাকা বোরো ধানের সমাহার। চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হলেও টানা বৃষ্টিতে সেই আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের হামুদার বিল, মহারাজপুর মাঠ, বিষয়খালী মাঠ, কুলফাডাঙ্গা, মায়াধরপুর, ভবানীপুর-রামনগর, রাজারামের বিল, ডাকাতিয়া, তেতুলবাড়িয়া, গড়িয়ালা, বৈডাঙ্গা ও রাঙ্গিয়ারপোতা এলাকার নিচু জমিতে জমে আছে বৃষ্টির পানি।
অনেক কৃষক ধান কাটলেও রোদ না থাকায় তা শুকাতে পারছেন না। ফলে ধানের খড় ভিজে বিচালি নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কোথাও কাটা ধান মাঠেই পড়ে আছে। শুকানোর সুযোগ না থাকায় কেউ কম দামে বিক্রি করছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে ফেলে রাখছেন।
সদর উপজেলার বিষয়খালী গ্রামের কৃষক আনারুল ইসলাম বলেন, “বৃষ্টি না থামায় ধান শুকাতে পারছি না। খড় সব ভিজে গেছে। গরুর খাবারের জন্য যে বিচালি রাখব, সেটাও নষ্ট হওয়ার উপক্রম।”
গড়িয়ালা গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, টানা বৃষ্টিতে ধান ঘরে তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। শ্রমিক সংকট ও অতিরিক্ত মজুরির কারণে খরচও বেড়ে গেছে।
একই চিত্র দেখা গেছে কালীগঞ্জ উপজেলার রায়গ্রাম, জামাল, কোলা, নিত্যানন্দপুর ও আগমুন্দিয়া এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। মহেশপুর ও হরিণাকুন্ডু উপজেলার অধিকাংশ নিচু জমিতেও পানি জমে রয়েছে। অনেক স্থানে কেটে রাখা ধান ভিজে অঙ্কুরিত হয়ে গেছে। ফলে সেই ধানের ন্যায্যমূল্যও পাচ্ছেন না কৃষকরা।
হরিণাকুন্ডু উপজেলার খামারি ইজল হোসেন বলেন, “গত বছর যে পরিমাণ বিচালি পাওয়া গিয়েছিল, এবার তার অর্ধেকও মিলছে না। বাজারে বিচালির দাম বাড়তে শুরু করেছে। সামনে গরুর খাবার নিয়ে বড় সংকট হতে পারে।”
কালীগঞ্জ উপজেলার বহেরগাছী গ্রামের কৃষক তাজুল ইসলাম বলেন, “ধান নিয়ে কৃষকের কষ্টের শেষ নেই। শ্রমিক নেই, পেলেও মজুরি বেশি। ধান বিক্রি করে খরচই ওঠে না। খড়-বিচালিই ছিল বাড়তি লাভ। এবার মনে হচ্ছে সেই লাভও থাকবে না।”
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে শুধু ধানের ক্ষতিই নয়, পশুখাদ্যের একটি বড় উৎসও হুমকির মুখে পড়েছে। সাধারণত বোরো মৌসুমে কৃষকরা সারা বছরের জন্য বিচালি সংরক্ষণ করেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে এবার সেই সুযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্র জানায়, ঝিনাইদহে ছোট-বড় মিলিয়ে হাজার হাজার গবাদিপশু রয়েছে। এসব পশুর প্রধান খাদ্যের একটি হলো ধানের বিচালি। সংকট দেখা দিলে খামারিদের বাড়তি দামে বিকল্প খাদ্য কিনতে হবে, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-এ-নবী বলেন, “আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় কৃষকরা ধান শুকাতে পারছেন না। এতে খড় ও বিচালির মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. কামরুজ্জামান বলেন, “ধান কাটা শুরু হওয়ার পর থেকেই মাঝেমধ্যে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। অনেক কৃষক শুধু ধানের শীষ কেটে নিচ্ছেন। জেলার বিভিন্ন মাঠে কম্বাইন্ড হারভেস্টার কাজ করছে। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং আবহাওয়ার তথ্যসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে এবার কৃষকরা তুলনামূলক কম খড় ও বিচালি পেতে পারেন।”
এদিকে স্থানীয় বাজারে ইতোমধ্যে বিচালির দাম বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কয়েকদিন আগেও যে দামে প্রতি আঁটি বিচালি বিক্রি হতো, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে বাড়তি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারিরা।