• সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০৭:৫৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বেলকুচিতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অপরাধে ৪ সিএনজি চালককে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত বিচারের নামে অবিচার ও দীর্ঘসূত্রিতায় দেশে অপরাধ বাড়ছে: ডা. শফিকুর রহমান হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শপিং মল বন্ধের নির্দেশনা তোফায়েল আহমেদের প্রথম জানাজা ধানমণ্ডিতে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এলো মে মাসে আদিতমারীতে দুলাভাইয়ের মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে প্রা’ণ গেল শ্যালিকার ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে সংবাদ বিতরণে নিরলস সুরমান গাজী বহুমাত্রিক প্রতিভা কবি আলমগীর কবীর হৃদয় এর ৪৮ তম জন্মদিন ভোলাহাটে বিদ্যুতের সর্টসার্কিটের আগুনে ৩টি বসতবাড়ীর ১১টি ঘর সম্পূর্ণ ভস্মিভূত!

১০ হাজার প্রাণ এবং একটি ঝুলন্ত বাঁধ/ পাইকগাছার আকাশে কি আবার প্রলয়ের মেঘ?

প্রতিবেদক / ১ বার
আপডেট : সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

শাহরিয়ার কবির (খুলনা)

বাতাসে এখন আষাঢ়ের আগাম বার্তা, কিন্তু খুলনার পাইকগাছার দুর্গম উপকূলীয় দ্বীপ ইউনিয়ন দেলুটির আকাশে অন্য এক মেঘ। সে মেঘ বর্ষার স্নিগ্ধতার নয়; সে মেঘ আতঙ্কের, সে মেঘ ঘরবাড়ি হারানোর চিরচেনা সর্বগ্রাসী আশঙ্কার। ভদ্রা নদীর তীব্র স্রোত যখন কালিনগর ওয়াপদার বেড়িবাঁধের ৪’শ মিটার এলাকা জুড়ে ক্ষ্যাপা মহিষের মতো থাবা বসাচ্ছে, তখন ২২নং পোল্ডারের ৫টি ওয়ার্ডের ১৩টি গ্রামের ১০ হাজার মানুষের বুকে চলছে হাতুড়ির ঘা। বাঁধের গায়ে জেগে ওঠা এক একটি বিশালাকার ফাটল যেন এই অবহেলিত জনপদের ভাগ্যকে উপহাস করছে। বিগত বছরের সেই দুঃসহ নরককুণ্ডের স্মৃতি মনে করে নারী, শিশু আর বৃদ্ধদের চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়েছে। রাত নামলেই জোয়ারের পানির শব্দে এই নদীপাড়ের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে এক অজানা ক্রন্দনে—কখন যেন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে পায়ের নিচের মাটি, কখন যেন নোনা জল এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় জীবনের শেষ সম্বলটুকু!

দেলুটির মানুষের কাছে দুর্যোগ কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার নিত্যদিনের নিষ্ঠুর লড়াই। বছরের পর বছর ধরে এখানকার মানুষ কেবল নদীর সাথেই যুদ্ধ করে না, যুদ্ধ করে টিকে থাকার নূন্যতম অধিকারের জন্য। গত বছর ২২ আগস্ট এই একই এলাকার ওয়াপদার বাঁধ ভেঙে যখন নোনা জল ঢুকেছিল, তখন মুহূর্তের মধ্যে পুরো ২২নং পোল্ডার তলিয়ে গিয়েছিল অতল সাগরে। ঘর নেই, দুয়ার নেই, রান্নার হাঁড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া সেই প্লাবনে মাথা গোঁজার মতো কোনো আশ্রয়কেন্দ্রও ছিল না দুর্গম এই দ্বীপে। হাজার হাজার মানুষকে তখন খোলা আকাশের নিচে, গবাদি পশুর সাথে পিচঢালা রাস্তায় যাপন করতে হয়েছিল এক পৈশাচিক ও মানবেতর জীবন।
বিগত ২০ বছর ধরে চলা এই ভাঙনের খতিয়ান দিতে গিয়ে এলাকার অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শ্যামল কান্তি রায় স্মৃতিকাতর ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন,বিগত দুই দশক ধরে এই ভাঙন আমাদের প্রতিনিয়ত নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর করে দিচ্ছে। চোখের সামনে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, বাপ-দাদার ভিটেমাটি আর অসংখ্য মানুষের আজীবনের উপার্জনে গড়া ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে দেখেছি। মানচিত্র থেকে একেকটি পাড়া হারিয়ে যাচ্ছে, অথচ আমরা আজও একটা টেকসই বাঁধ পেলাম না। এই নিয়তি আর কতদিন আমাদের তাড়া করে বেড়াবে?”
জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, নদীর এই রাক্ষুসে ভাঙন এবার আরও উত্তর দিকে অগ্রসর হয়েছে। গত বছর যেখানে বাঁধ ভেঙেছিল, তার থেকে ঠিক এক কিলোমিটার উত্তরে কালিনগর সাধু ঘাটের অমল কবিরাজের বাড়ি হতে শুরু করে প্রভাষ মণ্ডলের বাড়ি পর্যন্ত দীর্ঘ ৪’শ মিটার এলাকা এখন তীব্র ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। জোয়ারের প্রতিটা ঝাপটায় বাঁধের নিচের মাটি ধসে পড়ছে খণ্ড খণ্ড হয়ে, আর ভেতরের ফাটলগুলো চওড়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
২২নং পোল্ডার কেবল কিছু মানুষের মানবেতর বাসস্থানের নাম নয়, এটি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ফুসফুসও বটে। চারিপাশে নদীবেষ্টিত এই পোল্ডারের মাটি যেন সোনা ফলায়। প্রতি বছর এখানকার কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে উৎপাদিত হয় কোটি কোটি টাকার তরমুজ ও অন্যান্য মূল্যবান রবিশস্য। বর্তমানে মাঠ জুড়ে চলছে আমন ধান রোপণের মহোৎসব। কৃষকের ঘাম জড়ানো এই নতুন ফসল যদি ঘরে না ওঠে, তবে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি সলিল সমাধি লাভ করবে।
স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মোস্তফা সর্দার মাঠের দিকে তাকিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “বর্তমানে এলাকায় পুরোদমে আমন ধান রোপণ চলছে। কৃষকেরা তাদের শেষ সম্বলটুকু বিনিয়োগ করেছেন এই মাঠে। এই মুহূর্তে যদি বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢোকে, তবে আমন ফসলের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে, তা কাটিয়ে ওঠার সামর্থ্য এই অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের নেই। তখন এলাকায় দুর্ভিক্ষ নেমে আসা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।”
ফসলের এই বিপুল ক্ষতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘমেয়াদী আঘাতটা আসে এই অঞ্চলের কোমলমতি শিশুদের ওপর। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বছরের পর বছর ধরে ব্যাহত হচ্ছে এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা। যখনই বাঁধ ভাঙে, স্কুল-কলেজগুলো হয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়, না হয় নোনা জলের নিচে তলিয়ে থাকে মাসের পর মাস। স্থানীয় শিক্ষার্থী পিয়া মণ্ডল তার সহপাঠীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে জানায়, “দুর্যোগ এলেই আমাদের লেখাপড়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বই-খাতা ভাসিয়ে নিয়ে যায় পানি। আমাদের স্কুলগুলো বন্ধ থাকে মাসের পর মাস। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নয়।”
বাঁধের এই চরম সংকটাপন্ন অবস্থা এবং প্রশাসনের ধীরগতি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ক্ষোভ এখন আকাশচুম্বী। দেলুটি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুকুমার কবিরাজ স্পষ্ট ভাষায় নিজের ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “পোল্ডারের মানুষ চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রাত হলে কেউ ঘুমাতে পারে না। আমরা বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) তাগিদ দিয়েছি, হাতজোড় করেছি—দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে এই ভাঙন রোধ করার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। তারা প্রতিবারই আমাদের শুধু আশ্বস্তই করে গেছে, কিন্তু কাজের কোনো বাস্তব অগ্রগতি মাঠপর্যায়ে এখনো দৃশ্যমান নয়। মানুষ যখন ডুবে মরার উপক্রম, তখন তাদের এই উদাসীনতা মেনে নেওয়া যায় না।”
অন্যদিকে, এই তীব্র ক্ষোভের বিপরীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাঈদুর রহমানের বক্তব্য যেন প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক সুরেই বাঁধা। তিনি জানিয়েছেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে ডাম্পিং করার প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। বর্তমানে বালু মজুদকরণের কাজ চলছে এবং বস্তুজাত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই জিও ব্যাগ স্থাপন শুরু করা হবে।
কিন্তু সচেতন মহলের প্রশ্ন—প্রকৃতি কি পাউবোর এই ধীরগতির ‘কাগজি প্রস্তুতির’ জন্য ভদ্রা নদীর স্রোতকে থামিয়ে রাখবে? যখন নদীর জল ফুঁসে উঠছে, প্রতি সেকেন্ডে মাটি ধসে পড়ছে, তখন এই ধীরস্থির প্রস্তুতি নদীপাড়ের ভাগ্যবিদ্বেষী মানুষের মনে কতটা ভরসা জোগাতে পারে? বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর জিও ব্যাগ ফেলা আর চোর পালালে বুদ্ধি বাড়া—একই কথা।
দেলুটির চারিপাশে অথৈ জলরাশি, আর মাঝখানে খাঁচায় বন্দি ১০ হাজার মানুষের জীবন। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ফসল উৎপাদন করে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখেও এখানকার মানুষকে বাঁচতে হয় যাযাবরের মতো, যা সভ্য সমাজের জন্য এক বড় লজ্জার বিষয়। কেন বিগত ২০ বছরেও এই দুর্গম ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপাঞ্চলে একটি টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হলো না, সেই প্রশ্ন আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে তীরের মতো বিঁধছে।
জোড়াতালির জিও ব্যাগ কিংবা বাঁশের চটা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তা প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়—তা বিগত বছরগুলোতে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। কালিনগরের এই বাঁধটি যদি
আজ-কালের মধ্যে ভেঙে যায়, তবে তা কেবল একটি মাটির বাঁধ ভাঙা হবে না, তা হবে ১০ হাজার মানুষের স্বপ্ন, অধিকার, শিক্ষা আর বেঁচে থাকার আকুতির সলিল সমাধি। উপকূলের মানুষ আর কতকাল এই অবহেলার শিকার হবে? প্রশাসন কি এবারও বাঁধ ভাঙার পর ত্রাণের চাল নিয়ে জেগে উঠবে, নাকি ভাঙন রোধে যুদ্ধকালীন তৎপরতা দেখিয়ে প্রমাণ করবে যে তারা সত্যিই জনগণের সেবক? উত্তর লুকিয়ে আছে ভদ্রা নদীর উত্তাল তরঙ্গে আর পাউবোর আগামী কয়েক ঘণ্টার ভূমিকার ওপর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও

ফেসবুকে আমরা