দেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েছে। বেসরকারি সংস্থার হিসাবে, গত সাড়ে চার মাসে সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গেল দুই সপ্তাহে অন্তত চার শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। সার্বিকভাবে শিশুদের সুরক্ষাজনিত উদ্বেগ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো দায়বদ্ধ না থাকলে শিশুর ওপর সহিংসতা-নির্যাতন বন্ধ হবে না। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের সঙ্গে সমাজের নৈতিক অস্তিত্ব জড়িত বলেও জানাচ্ছেন তারা। এজন্য আলাদা কমিশন গঠনেরও তাগিদ দিয়েছেন তারা। শুধু বিচার নয়, সামাজিকভাবে ধর্ষককে চিহ্নিত করে দেওয়া উচিৎ বলে মত তাদের। সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে, শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় শিশু নীতিতে, সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে, নির্যাতন রোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ।
তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান ভয়াবহ এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে কমপক্ষে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণ-চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও অন্তত ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১৭ শিশুকে। প্রতিটি সংখ্যা, একটি থেমে যাওয়া শৈশব, একটি ভেঙে পড়া পরিবার, যা আতঙ্কিত সমাজেরই প্রতিচ্ছবি।বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, ‘(বাইরের দেশে) অনেক সময় দেখা যায়, যাদের এই ধরণের মানসিকতা, তাদেরকে সমাজে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের এখানে এমনটা হয় না। বরং দেখা যায় শিশুরা একটি অনিরাপদ পরিবেশে বড় হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুটা (আমাদের দেশে) খুব সহজ হয়ে গেছে- যেন এটা কোনো ব্যাপার না। এই “কোনো ব্যাপার না” মানসিকতাটা আমাদের মধ্যে এমনভাবে ঢুকে গেছে, বিশেষ করে যারা অপরাধপ্রবণ মানুষ তাদের জন্য অপরাধ করাটা খুব সহজ হয়ে গেছে।’
প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, সমাজের নৈতিক অস্তিত্বও এতে জড়িত। এক্ষেত্রে রাজনীতিকদের দায়বদ্ধতা না থাকলে অবস্থা বদলাবে না, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘যদি একটা চাইল্ড প্রোটেকশন কমিশন হয়, যারা শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রোটেকশনের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে, যারা শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ করছে তাদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স থাকবে। আমি মনে করি, এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় কখনোই গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই।’
এ বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনের আগে ইউনিসেফের একটি চাইল্ড রাইটস মেনিফেসটোতে (শিশু অধিকার ইশতেহার) স্বাক্ষর করে দেশের ১২টি রাজনৈতিক দল। কিন্তু তা সত্ত্বেও খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কার্যক্রমে এবং তাদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে শিশু সুরক্ষা কতটুকু ধারণ করে সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।’
গবেষকরা বলছেন, সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রই সত্যিকার অর্থে সভ্য।