খোলা আকাশের নিচে প্রখর গরম সহ্য করে দাঁড়িয়ে আছে বিক্রির জন্য প্রস্তুত ২০০টিরও বেশি গবাদিপশু। পশুগুলো বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বাঁধা থাকলেও আশপাশে কোনো ক্রেতার দেখা নেই।
কলকাতা থেকে ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা। সেখান থেকে এক হিন্দু বিক্রেতা হাটে এসেছেন। তিনি জানান, বুধবার ও বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া উৎসবকে সামনে রেখে পশু কিনতে তিনি চড়া সুদে একাধিক ঋণ নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় আড়াই কোটি বা ২৭ শতাংশ মুসলিম। তাই এই সময়ে ভালো ব্যবসা হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি বলছেন, এ বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কে গরু কিনবে? মানুষ এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, বলেন ওই বিক্রেতা। প্রশাসনের রোষানলে পড়ার ভয়ে তিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
কয়েক দশক ধরে ধুলাগড় পশুর হাটে মূলত হিন্দু বিক্রেতারাই আসতেন। আর মুসলিম ক্রেতারা কোরবানির প্রস্তুতি নিতে এখানে ভিড় করতেন। ছাগল বা ভেড়া ছাড়াও অনেক মুসলিম পরিবার একসঙ্গে টাকা জমিয়ে কোরবানি দেন। তারা যৌথভাবে একটি ষাঁড়, মহিষ বা উট কিনে কোরবানির জন্য এর মাংস সমান সাত ভাগে ভাগ করে নেন। ১৯৫০ সালের একটি আইন অনুযায়ী প্রকাশ্যে পশু জবাই নিষিদ্ধ। তবে সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় এই রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে মার্কসবাদী বা মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তি শাসন করেছে। তারা এই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করেনি। ফলে রাজ্য এবং এর রাজধানী কলকাতা এক সময় জমজমাট খাবারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এখানকার ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে ঠেলাগাড়ি এবং অসংখ্য রেস্তোরাঁয় গরুর মাংসসহ বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার বিক্রি হতো।
ধুলাগড় পশুর হাটে তিনজন হিন্দু বিক্রেতা তাদের আর্থিক দুর্দশার কথা বলছিলেন। তাদের একজন বলেন, কিছু গরু বিক্রি করতে পারলেও তারা এখনো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে আছেন। অবিক্রিত প্রতিটি পশুর জন্য তাদের প্রায় ৫ হাজার রুপি লোকসান হচ্ছে। এই মানুষগুলো বছরের বাকি সময় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
এই হাটের বিক্রেতাদের মধ্যে একজন মুসলিম পশু ব্যবসায়ীও আছেন। তিনি উৎসব উপলক্ষে পশু কিনতে তার মায়ের গয়না বন্ধক রেখে ১০ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছেন। তিনি বলেন, উৎসবের মৌসুমে তাদের পরিবার সাধারণত ১০ থেকে ১৫ লাখ রুপি আয় করে। গত বছর তিনি প্রায় ১০০টি গরু বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু এ বছর তার ২৫টি গরুর একটিও বিক্রি হয়নি। এখন কী করবেন, তা নিয়ে তিনি চরম আতঙ্কে আছেন।