চলমান তিন মাসব্যাপী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও মধ্যপ্রাচ্যে থামছে না সংঘাতের আগুন। সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও রক্তক্ষয়ী পারস্পরিক হামলায় জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গত সপ্তাহের শেষে ইরানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে মার্কিন বিমান হামলার জবাবে সোমবার কুয়েতে অবস্থিত একটি প্রধান মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
গত এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তির আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার সুযোগে দুই পক্ষই বিচ্ছিন্নভাবে এই ধরনের আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় টহলরত একটি মার্কিন এমকিউ-১ ড্রোন ইরান ভূপাতিত করার পর এর জবাবে তারা ইরানের পারস্য উপসাগরীয় উপকূলে বিমান হামলা চালায়।
মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো নিখুঁতভাবে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং দুটি ‘ওয়ান-ওয়ে’ আত্মঘাতী ড্রোন ধ্বংস করেছে, যা ওই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী জাহাজের জন্য স্পষ্ট হুমকি ছিল। সেন্ট্রাল কমান্ড জোর দিয়ে বলেছে, যুদ্ধবিরতি চললেও মার্কিন স্বার্থ ও সম্পদ রক্ষায় তারা এই ধরণের পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে।
অন্যদিকে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস সোমবার জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি বিমান ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যদিও নির্দিষ্ট করে কোনো ঘাঁটির নাম তারা উল্লেখ করেনি।
কুয়েতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কুনা জানিয়েছে, কুয়েত জুড়ে সোমবার সকাল থেকেই বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে এবং দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। উল্লেখ্য, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশাল এবং কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিতভাবে শুরু করা এই যুদ্ধের ফলে ইতিমধ্যে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এই চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এতো বড় সামরিক সংঘাতের মধ্যেও গভীর রাতে এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বৈরিতার কোনো উল্লেখ করেননি। বরং তিনি তাঁর আগের দাবিতেই অনড় থেকে বলেন, ইরান আসলে একটি স্থায়ী চুক্তি করতে খুবই আগ্রহী।
একই সাথে তিনি রিপাবলিকান পার্টির ভেতরের ও বাইরের সমালোচকদের যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য বা ‘কিচিরমিচির’ করা বন্ধ করার আহ্বান জানান। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লেখেন, আপনারা শুধু শান্ত হয়ে বসে থাকুন, শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে, সব সময়ই যেমনটা হয়ে থাকে!
আসন্ন নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের ওপর হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর তীব্র অভ্যন্তরীণ চাপ রয়েছে। কারণ, জিনিসপত্রের লাগামহীন দামে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
আবার একই সময়ে, তেহরানকে কোনো ধরণের ছাড় দিলে নিজের দলের কট্টরপন্থী ইরান-বিরোধীদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে তাঁর। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ইরানকে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা, যদিও তেহরান শুরু থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা অস্বীকার করে আসছে।
বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা শত শত কোটি ডলারের ইরানি তেলের রাজস্ব ফেরত পাওয়ার দাবিতে অনড় রয়েছে তেহরান। এর বাইরে, লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ এই শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রোববা সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই আরও জোরদার করতে সেনাদের লেবাননের আরও গভীরে প্রবেশের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে দফায় দফায় আলোচনা করছেন এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত করার একটি কূটনৈতিক পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছেন।