দেশের আমদানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯। নতুন নীতিতে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের আমদানিযোগ্য পণ্য নির্ধারিত মূল্যসীমার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ঋণপত্র না খুলে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উন্মুক্ত হিসাব পদ্ধতিতে আমদানির মূল্য পরিশোধের সুবিধাও দেওয়া হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংকিং কার্যক্রমে কিছুটা নমনীয়তা তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আমদানি নীতির অন্যান্য বিধিনিষেধ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত প্রচলিত নিয়ম যথারীতি বহাল থাকবে।
নতুন নীতির আওতায় রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানি ও স্থানীয়ভাবে সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় উৎস থেকে স্থানীয় মুদ্রায় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের মাধ্যমে উৎপাদন উপকরণ সংগ্রহের পাশাপাশি বিনা মূল্যে স্থানীয় উৎস থেকেও উপকরণ সংগ্রহের সুযোগ রাখা হয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার আওতায় উৎপাদন উপকরণ আমদানি ও সংগ্রহের বিষয়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-১ একটি সার্কুলার জারি করেছে। এতে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে নতুন আমদানি নীতি আদেশের বিধান অনুসরণ করে আমদানি ও স্থানীয়ভাবে উপকরণ সংগ্রহসংক্রান্ত লেনদেন নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০২৯ সাল পর্যন্ত কার্যকর
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা এসআরও নম্বর ৩০৮-আইন/২০২৬-এর মাধ্যমে গত ২৪ আগস্ট আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ জারি করা হয়। নতুন আদেশটি ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে এর মধ্যে নতুন কোনো আমদানি নীতি আদেশ জারি না হলে পরবর্তী নতুন আদেশ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নীতির বিধান কার্যকর থাকবে।
সরকারি গেজেটেও ২৪ আগস্ট জারি করা নতুন আমদানি নীতি আদেশ প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক বছর দেশের আমদানি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত কাঠামো হিসেবে কার্যকর থাকবে।
উন্মুক্ত হিসাব পদ্ধতিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ
নতুন আমদানি নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো উন্মুক্ত হিসাব পদ্ধতিতে আমদানির মূল্য পরিশোধের সুযোগ। আমদানি নীতি আদেশের অনুচ্ছেদ ৫(ম)-এ এ সুবিধার বিধান রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারেও বিষয়টি অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে জানানো হয়েছে।
এ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, বিধি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
এলসি ছাড়াই আমদানির সুযোগ
শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে আমদানির ক্ষেত্রে নতুন নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৬(৩) অনুযায়ী, আমদানিযোগ্য সব পণ্য নির্ধারিত মূল্যসীমার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ঋণপত্র না খুলে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানি করা যাবে।
এর ফলে আমদানিকারকদের পণ্য আনার ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলার ওপর নির্ভরতা কমবে। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে আমদানি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিয়মিত ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে উপকৃত হতে পারে।
তবে এলসি ছাড়া আমদানির সুযোগের অর্থ এই নয় যে সব পণ্য যেকোনো শর্তে আমদানি করা যাবে। পণ্যের শ্রেণি, নিষেধাজ্ঞা, নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় অনুমোদনসহ আমদানি নীতিতে থাকা অন্যান্য বিধানও যথারীতি অনুসরণ করতে হবে।
রফতানিমুখী শিল্পে স্থানীয় উপকরণ সংগ্রহে সুবিধা
রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানি ও সংগ্রহের ক্ষেত্রেও নতুন নীতিতে সুবিধা রাখা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৫-এর আওতায় স্থানীয় উৎস থেকে স্থানীয় মুদ্রায় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের মাধ্যমে উৎপাদন উপকরণ সংগ্রহ করা যাবে। পাশাপাশি বিনা মূল্যে স্থানীয় উৎস থেকেও উপকরণ সংগ্রহের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এতে পোশাকসহ বিভিন্ন রফতানিমুখী শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে দ্রুত উপকরণ সংগ্রহের সুযোগ বাড়তে পারে। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও সময় কমানোর পাশাপাশি রফতানি কার্যক্রমে সময়ের চাপও কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া উৎপাদন উপকরণ আমদানি বা সংগ্রহের ক্ষেত্রে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার প্রযোজ্যতা নিয়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রয়েছে।
ব্যাংকের তদারকি থাকছে
নতুন নীতিতে
আমদানিকারকদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ করা হলেও অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব কমেনি। বরং আমদানি ও স্থানীয়ভাবে উপকরণ সংগ্রহসংক্রান্ত লেনদেন নিষ্পত্তির সময় আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত প্রচলিত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ এলসি খোলার বাধ্যবাধকতা কিছু ক্ষেত্রে না থাকলেও ব্যাংকিং তদারকি পুরোপুরি উঠে যাচ্ছে না। আমদানিকারকদের চুক্তি, পণ্যের বিবরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং লেনদেনের বৈধতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকগুলোকেও এসব লেনদেনের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও নথিপত্র সংরক্ষণ করতে হবে।
ব্যবসা সহজ করার নতুন পদক্ষেপ
নতুন আমদানি নীতির মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে আমদানি কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় নমনীয়তা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূল্যসীমার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই চুক্তির মাধ্যমে এলসি ছাড়া আমদানির সুযোগ এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উন্মুক্ত হিসাব পদ্ধতিতে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন বিকল্প তৈরি করেছে।
অন্যদিকে রফতানিমুখী শিল্পে স্থানীয় উৎস থেকে উৎপাদন উপকরণ সংগ্রহের সুযোগ বাড়ানো হলে দেশীয় সরবরাহব্যবস্থাও আরও সক্রিয় হতে পারে। স্থানীয় মুদ্রায় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের মাধ্যমে উপকরণ সংগ্রহের সুযোগ রফতানি শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থায় গতি আনতে সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন আমদানি নীতিতে একদিকে আমদানি প্রক্রিয়ায় নমনীয়তা বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নিয়ন্ত্রিত কাঠামোও বহাল রাখা হয়েছে। নতুন নীতির ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য আমদানি লেনদেনে বিকল্প পদ্ধতি বাড়ার পাশাপাশি রফতানিমুখী শিল্পে উপকরণ সংগ্রহ সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।