আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের বিপরীতে তেহরান যে পাল্টা শর্ত দিয়েছে, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে ইরান দাবি করেছে, তাদের প্রস্তাব ‘যুক্তিসঙ্গত, দায়িত্বশীল ও বৈধ’, বরং বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি যুক্তরাষ্ট্র নিজেই।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পাঠানো তেহরানের প্রস্তাবে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌম অবস্থানও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের পাঠানো জবাব তার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। একই সঙ্গে তিনি আবারও অভিযোগ করেন, তেহরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচি নিয়ে পূর্বের অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের প্রাথমিক ১৪ দফা প্রস্তাবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এসব শর্ত চূড়ান্ত সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পুরোপুরি অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে বিবেচনা করা যাবে না। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সরাসরি মার্কিন প্রস্তাব নিয়ে মন্তব্য না করলেও বলেছেন, “আমরা কখনো শত্রুর সামনে মাথা নত করব না। আলোচনা মানেই আত্মসমর্পণ নয়।”
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরানের দাবিগুলো ইরানের বৈধ অধিকার। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুদ্ধ বন্ধ, ইরানি জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত চাওয়া কীভাবে অযৌক্তিক হতে পারে?
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাঘাই যুক্তরাষ্ট্রকে “বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি” বলে আখ্যা দেন। তার অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও উপস্থিতিই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে।
চলমান এই সংকটে হরমুজ প্রণালি আবারও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান ইতোমধ্যে প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করেছে এবং কয়েকটি ঘটনায় হামলার অভিযোগও উঠেছে।
ইরানের সামরিক মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। তার ভাষায়, উত্তর ভারত মহাসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে যেতে দেওয়া হবে না।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ওমানে মার্কিন ঘাঁটি সক্রিয় রয়েছে। নতুন করে একটি যুদ্ধজাহাজও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল সুরক্ষায় যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সামরিক উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে ৪০টির বেশি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বৈঠকে বসছেন বলে জানা গেছে। তবে ইরান আগেই সতর্ক করেছে, ব্রিটেন বা ফ্রান্স কোনো বাহিনী মোতায়েন করলে তার “তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব” দেওয়া হবে।
এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর একীভূত কমান্ডের প্রধান এবং খতম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদরদপ্তরের কমান্ডার আলী আবদুল্লাহির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, বৈঠকে সামরিক প্রস্তুতি ও নতুন রণকৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
আলী আবদুল্লাহি বলেছেন, “শত্রুপক্ষ কোনো ভুল করলে ইরান দ্রুত, কঠোর ও চূড়ান্ত জবাব দেবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য ভুল হিসাবও বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।